প্রয়াত হওয়ার এক মাস পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। সরকারের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এতে অংশ নিয়ে খালেদা জিয়াকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। তাঁর কর্মময় জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন বক্তারা। আগামী দিনে বিএনপিকে খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া আদর্শ ধারণ করে চলার পরামর্শও দেন তাঁরা।
খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম ও গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধার কথা তুলে ধরে বক্তারা বলেন, জীবদ্দশায় বেগম খালেদা জিয়া সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নাগরিক সমাজের উদ্যোগে এ শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়।
শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে. আর. মোদাচ্ছির হোসেন। উপস্থাপনা করেন আশরাফ কায়সার ও কাজী জেসিন।
এ সময় দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, গবেষক, চিকিৎসক, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিনিধি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও বিভিন্ন পেশাজীবী নেতা উপস্থিত ছিলেন।
বিকেল ৩টার দিকে পূর্বনির্ধারিত এ শোকসভা শুরু হয়। এতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।
গত ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন সংসদ এলাকায় তাঁর বিশাল জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁকে জিয়া উদ্যানে জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণ করে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, বাংলাদেশকে ভালো থাকতে হলে বেগম খালেদা জিয়াকে ধারণ করতে হবে। বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালে আমি তাঁর জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিতে যেতাম। তখন আমি একটি কথা বলতাম—বেগম জিয়া ভালো থাকলে ভালো থাকবে বাংলাদেশ। আমি বিশ্বাস করি, তিনি এখন ভালো আছেন। কিন্তু বাংলাদেশ কি ভালো আছে বা ভালো থাকবে? বাংলাদেশকে ভালো রাখতে হলে বেগম জিয়াকে ধারণ করতে হবে।
খালেদা জিয়ার অনেক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি সৎ ছিলেন, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, আত্মত্যাগী ছিলেন, দেশপ্রেমিক ছিলেন। তাঁর মধ্যে রুচির এক অবিস্মরণীয় প্রকাশ ছিল। তিনি পরমতসহিষ্ণু ছিলেন। বাংলাদেশকে ভালো রাখতে হলে বেগম জিয়াকে ধারণ করতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, আল্লাহর কাছে হাজার শোকর যে আজ আমরা মুক্তভাবে বেগম জিয়ার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে পারছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আজ স্বাধীনভাবে ঘৃণাও প্রকাশ করতে পারছে, স্বাধীনভাবে ভালোবাসাও প্রকাশ করতে পারছে। এজন্য এক নেত্রীর ঠাঁই হয়েছে মানুষের হৃদয়ে, আরেকজনের ঠাঁই হয়েছে বিতাড়িত ভূমিতে।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর একাধিকবার সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয়েছে। একজন স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে খালেদা জিয়া তাঁর মন জয় করে নিয়েছিলেন।
মাহফুজ আনাম বলেন, দেশকে ভালোবেসে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। জেল ও গৃহবন্দিত্বসহ নানা নির্যাতনের পরও ৭ আগস্ট মুক্ত হয়ে দেওয়া ভাষণে খালেদা জিয়া প্রতিশোধের কথা বলেননি। তিনি বলেছিলেন ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়—ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। এই উদারতা যদি আমরা মনে-প্রাণে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে একটি জ্ঞানভিত্তিক দেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়ার শেষ বাণী ছিল জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান। বিএনপিসহ সবাইকে এটি ধারণ করতে হবে।
যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, যে করেই হোক ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস সবাইকে আশ্বাস দিচ্ছেন এবং বারবার বলছেন যে ওই নির্বাচন হবে একটি আনন্দমুখর, উৎসবের দিন। তিনি নিজেও তা প্রত্যাশা করেন। তবে এর জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
শফিক রেহমান বলেন, তিনি আশা করেন ভোটের দিন পুলিশ বাহিনী ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ভোটকেন্দ্র যেন সত্যিকার অর্থে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে এবং সবাই সপরিবারে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন। তিনি বলেন, আজকের এই শোকসভাকে অর্থবহ করতে হলে এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা সহিংসতার মাধ্যমে যেন গোটা জাতির নির্বাচনী আশা নষ্ট না হয়।
শোকসভায় নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, বেগম খালেদা জিয়া সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি কেবল একটি জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী ছিলেন না। দলমত নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণই তার প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, মানুষ ও রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার যে গুণটি তাঁকে বরাবরই আকৃষ্ট করেছে, তা হলো তাঁর রুচিশীলতা ও পরিমিতিবোধ। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শালীনতা ও সংযমের ঘাটতি প্রকট, তখনও তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া আঘাত ও দুর্ভোগের প্রতিক্রিয়ায় কখনো প্রকাশ্যে নিজের বেদনা, ক্ষোভ বা নিন্দাসূচক বক্তব্য দেননি।
বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জানাজার নামাজে বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বিএনপির এক নেতা লাখ লাখ মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তাঁদের রাজনীতি খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত হবে। এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য তিনি বিএনপির প্রতি অনুরোধ জানান।