বৃহঃস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারী ২০২৬, ২রা মাঘ ১৪৩২


কুষ্টিয়ার মোকামে বেড়েছে সব ধরনের চালের দাম


প্রকাশিত:
১৫ জানুয়ারী ২০২৬ ১১:৪৮

আপডেট:
১৫ জানুয়ারী ২০২৬ ১৯:৫৫

ছবি-সংগৃহীত

দেশের অন্যতম বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে বেড়েছে। সরু চালের জন্য প্রসিদ্ধ এই মোকামে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে মাঝারি ও মোটা চালের বাজারেও। বছরের শুরুতেই চালের এমন ঊর্ধ্বগতি ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তবে মিলাররা বলছেন, ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে চালের দাম। যদিও প্রশাসন বলছে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন তারা।

বছরের শুরুতে মোকামে চালের দাম নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে অসন্তোষ বেড়েছে। বিশেষ করে কুষ্টিয়ার পৌর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সব রকম চালের দাম কেড়িতে বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা করে। গত ৩-৪ দিন ধরে সব রকম চালের দাম বেড়েছে। বাসমতি ৯২ টাকা থেকে বেড়ে ৯৪ টাকায়, মিনিকেট ৭৪ টাকা থেকে ৭৭ টাকা, কাজললতা ৬৬ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬৮ টাকায়, আটাশ চাল ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায় আর মোটা চাল ৫০ টাকা থেকে বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকায়।

মোকামে চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে পড়েছে প্রভাব। যদিও চালের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ জানা নেই খুচরা বিক্রেতাদের।

কুষ্টিয়া পৌর বাজারের চাল বিক্রেতা রিপন হোসেন বলেন, অনেক দিন ধরেই চালের বাজার স্থিতিশীল ছিল। এখনও পর্যাপ্ত চাল আছে। উৎপাদিত চালও আছে। বিশেষ করে এখন সিজেন। মিলাররা বলছেন তাদের ধানে প্রতি মণে ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ধানের দাম বৃদ্ধি হওয়ার কারণে এখন বর্তমানে নতুন ধানের যে চাল বের হচ্ছে সে সব ধানের চালের দাম মিলাররা একটু বেশি চাচ্ছে। তবে যে গুলো কম দামের চাল আছে সে গুলো এখনও কম দামেই মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, যে গুলো পুরাতন বৈশাখে ওঠা পুরাতন চাল যেগুলো আবার বৈশাখে উঠবে সে চালের দাম বেড়েছে। আমরা সবাই মিলের ওপর নির্ভরশীল। মিল থেকে যে ভাবে কেনা হবে আমরা সে ভাবে বিক্রি করব। মিলাররা ধানের দাম বাড়ার কারণে যেভাবে চালের দাম নির্ধারণ করে আমাদের দেবে সেভাবে কেনা বেচা হবে।

কুষ্টিয়া পৌর বাজারের আরেক বিক্রেতা রঞ্জুর হোসেন নিশান বলেন, চাল এই বাজারে কেজি প্রতি ২ টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন- মিনিকেট, বাসমতি, কাজললতা, আঠাশ। আমরা যখন কাস্টমারের কাছে ২ টাকা বেশি চাচ্ছি কেজি প্রতি তখন তারা খুব বিরক্ত হচ্ছে। এই ভরা মৌসুমেও চালের দাম বেড়েছে। এই বড় বড় মিলাররা যদি মনে করে ধান ও চালের দাম বাড়বে না, তারা কিন্তু পারে। কিন্তু আমরা যখনই মিল গেটে চাল কিনতে যাচ্ছি, তখন তারা বলছে ভাই ধানের দাম বেশি তাই চালের দামও বেশি।

তিনি আরও বলেন, আমরা এখন মানতে রাজি না। কারণ ধানের এখন ভরা মৌসুম। এটা দ্রুতই যেন সরকার পদক্ষেপ নেয় চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। আর চাল যদি বাইরে থেকে আমদানি করে সেক্ষেত্রে অনেকখানি বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তবে অনেক কাস্টমার বলছেন আমরা দোকানদাররা দাম বাড়িয়ে চাল বিক্রি করছি। এই অপবাদ অযৌক্তিক। কারণ আমরা চাল মেমো নিয়ে কিনছি। বাজারের বোর্ডে কেনা দাম ও বিক্রির দাম লিখে দিচ্ছি। একমাত্র সরকারের পদক্ষেপ ছাড়া এই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ হবে না।

এদিকে চালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ খেটে খাওয়া সাধারণ ক্রেতারা। রিকশাচালক নাজিম উদ্দিন বলেন, এমনিতেই অন্য জিনিসের দাম বেশি তার ওপর চালের দাম বেড়েছে। চাল ৪ টাকা, ৫ টাকা আবার ৩টাকা বেশি দিয়েও কিনতে হচ্ছে। ৩ জনের সংসারে রিকশা চালিয়ে আমি যে মজুরি পাই তাতে চলে না। আমাদের যা আয় তাতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কষ্টে আছি। তাই আমি চাই চালের দাম কম থাকলে অন্তত কোনো রকম সংসার চালিয়ে নিতে পারব।

কুষ্টিয়া পৌর বাজারে বাজার করতে আসা নাসরিন সুলতানা বলেন, আসলে চাল আমাদের প্রধান খাদ্য। আমাদের আয় বাড়লো না কিন্তু চালের দাম বেড়ে গেল। এটা খুবই সমস্যা। কারণ আমরা নির্দিষ্ট একটা নিয়মের মধ্যে চলি। হঠাৎ যদি এভাবে চালের দাম বেড়ে যায় তাহলে এটা অনেক বড় সমস্যা। আমরা চাই নিয়মিত বাজার মনিটরিং হোক। সরকার একটা পদক্ষেপ নিক। এত দ্রুত চালের দাম না বৃদ্ধি পাক এটা আপমাদের খুবই সমস্যা হচ্ছে। আমরা বাঙ্গালী ভাত ছাড়া বাঁচি না। চালের দামই যদি বেড়ে যায় তাহলে আমাদের খুবই সমস্যা হবে। বিশেষ করে গরিব মানুষ আরো কষ্টে আছে।

চালকল মালিকরা দাবি করছেন, বেশি দামে ধান কেনার জন্যই মোকামে চালের দাম বেড়েছে।

কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান বলেন, আমাদের কুষ্টিয়ার মোকামে যে সরু চাল অর্থাৎ মিনিকেট চাল এই ধানের দাম মণ প্রতি বেড়েছে ১২০ টাকা থেকে ১৩০ টাকা। সেই তুলনায় চালের দাম প্রতি কেজিতে ২ টাকা বৃদ্ধি হয়েছে। সরকারের খাদ্য অধিদপ্তরের চাল সরবরাহের যে সময় ছিল এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখে কিন্তুখাদ্য অধিদপ্তর সেটাকে নির্ধারণ করেছে গেল বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই প্রথম সরকার আমাদের কাছ থেকে এত দ্রুত চাল নিয়ে নিয়েছে। একেকজন মিল মালিক ৫’শ থেকে ৬’শ টন চাল খাদ্য অধিদপ্তরে সরবরাহ করে। যার কারণে তারাহুরো করে খাদ্য অধিদপ্তরে চাল দিতে যেয়ে মিল মালিকরা গোডাউন ফাঁকা করে সরু বা মিনিকেট চাল সরবরাহ করে দেয়। যার কারণে গোডাউন ফাঁকা হওয়ায় ধান কেনায় প্রচুর চাপ ও এক কৃষকের কাছে ৫ মিল মালিকের লোক যাওয়ায় কৃষকও ধানের দাম বাড়িয়ে দেয়। তাই বাড়তি দামে ধান কেনা লাগছে।

তিনি বলেন, দাম বৃদ্ধির কারণে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে আমাদের মিল মালিকদের বৈঠক হয়েছে। আমাদের সবার ধান কেনা হয়ে গেছে। সামনে রমজান মাস এর আগে আর দাম বৃদ্ধি হবে না।

তিনি আরও বলেন, সরকার যদি মিনিকেট ও বাসমতি চাল এলসি করে তাহলে বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রন থাকবে।

কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, বাংলাদেশে চালের যে দাম তা বাড়া বা কমার ক্ষেত্রে কুষ্টিয়ার একটি ভূমিকা আছে। সেকারণে আমরা এটি নিয়ে খুব তৎপর। আমি চালকল মালিকদের নিয়ে একটি সভা করেছি। সেখানে জেলার সকল চালকল মালিকরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রতি আমাদের যে নির্দেশনা কোনোভাবেই চালের দাম বাড়ানো যাবে না। তাদের পক্ষ থেকেও একটা দাবি ছিল তারা যে জায়গা থেকে ধান সংগ্রহ করেন সেই ধানের দাম বাড়ানো হচ্ছে। তারা দুইটি জেলার নাম উল্লেখ করেছেন নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

তিনি বলেন, আমি এখানে বসেই নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের যে ডিসি আছেন তাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তারা বলেছেন তারা এখনই অ্যাকশন নেবেন। যাতে ওখানে ধানের যে দামটি বাড়ানো না হয়। আমার বিশ্বাস ওদিকে যদি ধানের দাম না বাড়ে তাহলে এখানেও চালের দাম বাড়বে না। আমি বলেছি, এটা কোনোভাবেই বাড়ানো যাবে না কারণ সামনে রোজা। মানুষের যেন ভোগান্তি না হয়। যদি কোনোভাবে তারা ধানের দাম বা চালের দাম বাড়ায় তাহলে আমাদের যে আইনি প্রক্রিয়া আছে সেটি আমরা অবলম্বন করব। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব এবং শাস্তি আরোপের দিকে যাব।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক: মো. জেহাদ হোসেন চৌধুরী

রংধনু মিডিয়া লিমিটেড এর একটি প্রতিষ্ঠান।

Developed with by
Top