বুধবার, ২৫শে মার্চ ২০২৬, ১১ই চৈত্র ১৪৩২


একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখন বিশ্বমঞ্চে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:২৫ মার্চ ২০২৬, ১৮:৫৬

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

২৫ মার্চ ১৯৭১। কালরাত। বিশ্বমানবতার এক কলঙ্কময় অধ্যায়। ঘুমন্ত সাধারণ মানুষের ওপরে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী চেয়েছিল চিরতরে বাঙালিকে নৃশংসভাবে নিধন করতে। কিন্তু বাঙালিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, বরং স্ফুলিঙ্গের মতো দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছিলো শহর থেকে গ্রামে।

সেই রাতে পাকিস্তান বাহিনীর সুপরিকল্পিত অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।

২৫ মার্চ বেলা ১১টায় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান মেজর জেনারেল খাদিম হুসেইন রাজাকে ফোন করে বলেন ‘খাদিম, আজকেই সেই রাত।’ প্রায় মাসখানেক আগে থেকে তৈরি হতে থাকে এই সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের।

উত্তাল মার্চ

মার্চ মাস জুড়ে ছিল সারা দেশে স্বাধিকার সংগ্রাম। ১-৭ মার্চ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে। সরকারি প্রেস নোট জানায়, এক সপ্তাহে নিহত ১৭১ ও আহত ৩৫৮। চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর, যশোর ও রাজশাহীতে ব্যাপক সংঘর্ষ। রাজশাহী, খুলনা ও যশোর টেলিফোন ভবন আক্রান্ত, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সৈয়দপুরে বাঙালি-অবাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড ঘটে।

৭ মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড সকালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ৩২ নম্বরে স্বল্পকালীন গোপন বৈঠক করেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পরিষ্কার ভাষায় ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের কথা বঙ্গবন্ধুকে জানিয়ে দেন। এই সিদ্ধান্ত ছিল, ‘পূর্ব বাংলায় স্বঘোষিত স্বাধীনতা হলে যুক্তরাষ্ট্র তা সমর্থন করবে না।’

এরপর আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ পুনরায় বৈঠকে মিলিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবিত বক্তৃতা সর্ম্পকে বিস্তারিত আলোচনা করেন। নানা আলোচনা পর্যলোচনা শেষে বেলা ৩টা ২ মিনিটে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রদান করেন। উত্তপ্ত জনতার মাঝে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে বলে ওঠলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

অবিস্মরণীয় সেই ভাষণ সব মহলে ব্যাপক প্রসংশিত হয়। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক কৃতর্পক্ষ পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন দিতে ব্যর্থ হলেন। ওইদিন বিকেল পৌনে চারটায় পূর্ব বাংলায় নতুন গর্ভনর লে. জেনারেল টিক্কা খান ঢাকায় আসেন।

৯ মার্চ চারদিকে থমথমে পরিবেশ। আন্দোলনমুখী মানুষ ছিল উত্তপ্ত। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পুরো নেতৃত্ব জাতীয়তাবাদী শক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন। এই সময়ে ঢাকার পল্টন ময়দানে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বলেন,

“একদিন ভারতের বুকে নির্বিচারে গণহত্যা করিয়া জালিয়ানওয়ালাবাগের মর্মান্তিক ইতিহাস রচনা করিয়া অত্যাচার অবিচারের বন্যা বহাইয়া দিয়াও প্রবল পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সরকার শেষ রক্ষায় সক্ষম হয় নাই। শেষ তাহাদের শুভবুদ্ধির উদয় হইয়াছে। পাক-ভারত উপমহাদেশকে শত্রুতে পরিণত না করিয়া সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মধ্যে একদিন সূর্য অস্ত যাইত না, রূঢ় বাস্তবতার কষাঘাতে সে সাম্রাজ্যের সূর্য আজ অস্তমিত। ...প্রেসিডেন্ট  ইয়াহিয়াকেও তাই বলি, অনেক হইয়াছে, আর নয়। তিক্ততা বাড়াইয়া আর লাভ নাই। ‘লা-কুম দ্বীনুকুম অলইয়াদ্বীন’-এর (তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার) নিয়মে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া লও।... মুজিবের নির্দেশ মতো আগামী ২৫ তারিখের মধ্যে কোনো কিছু করা না হইলে আমি শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত মিলিত হইয়া ১৯৫২ সালের ন্যায় তুমুল আন্দোলন শুরু করিব। খামোকা কেহ মুজিবকে অবিশ্বাস করিবেন না, মুজিবকে আমি ভালো করিয়া চিনি।”

১৬ মার্চ সকালে ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবনে শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইয়াহিয়া খানের মধ্যে প্রথম বৈঠক শুরু হয়। বর্তমান রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধা তখন ছিল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভবন। সাদা রঙের গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে মুজিব যখন সেখানে পৌঁছান, তখন ভবনের বাইরে হাজার হাজার মানুষ 'জয় বাংলা' এবং 'জয় বঙ্গবন্ধু' স্লোগানে আকাশ প্রকম্পিত করে তোলে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে সেই বৈঠক। ভবনের ভেতরে আলোচনার টেবিলে চলছিল রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক আর বাইরে বাংলার মানুষ প্রস্তুতি নিচ্ছিল অনিবার্য সংঘাতের।

১৯ মার্চ জয়দেবপুরে সামরিক বাহিনীর গুলিবর্ষণ ও কারফিউ জারি। বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে বললেন, ‘তারা (সামরিক জান্তা) যদি মনে করে থাকে যে, বুলেট দিয়ে জনগণের সংগ্রাম বন্ধ করতে সক্ষম হবে, তাহলে তারা আহম্মকের স্বর্গে বাস করছে।’

এইদিন রাজধানী ঢাকা নগরীতে অসংখ্য প্রতিবাদ সভা ও শোভাযাত্রা হলো। সেদিন ইয়াহিয়া-মুজিব নব্বই মিনিট ধরে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সন্ধ্যায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ এবং ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে ইয়াহিয়ার পরামর্শদাতাদের পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের ব্যাখা জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বলেন, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময়েও তিনি কালেমা পাঠের সঙ্গে 'জয় বাংলা' উচ্চারণ করবেন।

এক ভয়ংকর কালরাত

২৩ মার্চ ছিল ‘পাকিস্তান দিবস।’ সেই দিনটিকে পালন করা হয় ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে। রেডিও, টেলিভিশনে প্রচার করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘সোনার বাংলা’ গানটি। নতুন জাতীয় পতাকা ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। এভাবে চলতে থাকে সারা দেশে আন্দোলন-সংগ্রাম।

২৫ মার্চ সকালে জুলফিকার আলী ভুট্টো তার পার্টির পরামর্শদাতা জে. এ. রহিম এবং মোস্তফা খানকে সঙ্গে করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনা করলেন। ৪৫ মিনিটব্যাপী এই বৈঠকে লে. জেনারেল পীরজাদাও উপস্থিত ছিলেন। পরে সাংবাদিকদের কাছে ভুট্টো সাহেব ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কথাবার্তা বলেন, বিকেলে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পিপলস্ পার্টির নেতৃবৃন্দের আবার বৈঠক হবে।

কেননা প্রেসিডেন্ট ও শেখ মুজিবের পরামর্শদাতাদের মধ্যে গতকালের বৈঠকে ‘নতুন অবস্থার’ সৃষ্টি হয়েছে। এজন্যই তিনি প্রেসিডেন্ট ও পীরজাদার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। সাংবাদিকরা প্রশ্ন রাখলেন, ‘তাহলে কি আলোচনা ভেঙে গেছে?’ জবাবে ভুট্টো পাশ কাটিয়ে বললেন, ‘আমরা কোনো অসুবিধার সৃষ্টি করছি না।’

স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ভুট্টো বললেন, ‘আওয়ামী লীগ যে ধরনের স্বায়ত্তশাসন চাচ্ছে তাকে আর প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন বলা চলে না। ওদের দাবি তো স্বায়ত্তশাসনের চেয়েও বেশি-প্রায় সার্বভৌমত্বের কাছাকাছি।’

দিনভর চলতে থাকে ঢাকা, লাহোর নানা আলোচনা। আলোচনা সুবিধাজনক না হওয়ার কারণে প্রেসিডেন্ট সামরিক পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা তৈরি করে রাখেন। খাদিম হুসেইন রাজা এবং রাও ফরমান আলী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর খসড়া তৈরি করেন।

শুরুতেই ঠিক হয়, ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান শহরগুলোয় বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা, ছাত্রনেতৃবৃন্দ এবং বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গ্রেপ্তার ও প্রয়োজনে হত্যা আর সামরিক আধা সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্র করে শেখ মুজিবের চলমান শাসনের অবসান ঘটানো হবে। সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকায় অভিযানের নেতৃত্ব দেবেন রাও ফরমান আলী, আর অন্যান্য অঞ্চলে খাদিম হুসেইন রাজা। সে অনুযায়ী দুজন আলাদা দুটি পরিকল্পনা করেন।

সন্ধ্যায় কমান্ড হাউসে টিক্কা খান ও হামিদ খানের সামনে সেটি তুলে ধরেন রাজা। পরিকল্পনাটি তখনই অনুমোদিত হয়ে যায়, শুধু দিনক্ষণ অনির্ধারিত থাকে। ২৫ মার্চ সকালে সেটাও জানা হয়ে যায়। অভিযান শুরু হবে ২৬ মার্চ রাত একটায়। কিন্তু ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বাঙালিরা ততক্ষণে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তাই নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘণ্টা আগেই সেনাবহর রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকা সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে পড়ে।

ফার্মগেটে মিছিলের ওপর গুলি চালিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের সূচনা করে তারা। তারপর রাতভর চলে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চলে নির্বিচার মানবনিধন।

২৬ মার্চ সকাল সকাল ব্যারাকে ফিরে আসে সেনাদল। ভোর পাঁচটার দিকে মার্শাল ল হেডকোয়ার্টারের বারান্দা থেকে আশপাশ পর্যবেক্ষণ করে রুমাল দিয়ে চশমা মুছতে মুছতে তুষ্ট টিক্কা খান বলেন, ‘ওহ, একটা প্রাণীও নাই!’

লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রতিবেদক ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং পরে দাবি করেন, শুধু ঢাকায় ওই এক রাতেই অন্তত সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। আবার রবার্ট পেইন মনে করেন, এ সংখ্যা ৫০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কেউই অস্বীকার করেন না যে, সেই রাতে ঢাকার পথে-ঘাটে-হোস্টেলের বারান্দায় অসংখ্য লাশ পড়ে ছিল।

পরের দিনগুলোয় বিদেশি পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত কিছু দৃশ্য পৃথিবীর বিবেককে নাড়া দিয়েছিল, যদিও তখন পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বেশিরভাগ বিদেশি সাংবাদিককে বহিষ্কার বা নিষিদ্ধ করে রাখায় তাৎক্ষণিকভাবে এই নিষ্ঠুরতা বিশ্বের দরবারে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।

ঘটনার তিনদিন পর ওয়াশিংটনে পাঠানো একটি টেলিগ্রাম বার্তায় ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞকে ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ আখ্যায়িত করেন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড। তার হিসাবে সব মিলিয়ে ৪ থেকে ৬ হাজার মানুষ সেদিন মারা গিয়েছিল।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার লে. জেনারেল এ কে নিয়াজি তার দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান বইয়ে পরে লিখেছেন, ‘অভিযানটি ছিল নিষ্ঠুরতার চরম নিদর্শন। বুখারায় চেঙ্গিস খান, বাগদাদে হালাকু খান অথবা জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের গণহত্যার চেয়েও নির্মম। জেনারেল টিক্কা, তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অর্থাৎ সশস্ত্র বাঙালি ইউনিট ও ব্যক্তিদের নিরস্ত্রীকরণ এবং বাঙালি নেতাদের আটক করার পরিবর্তে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করেন। সৈন্যদের প্রতি তার নির্দেশ ছিল, “মানুষ না, মাটি চাই।” ঢাকায় এই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ফরমান–জাহানজেব আরবাব। অথচ চাইলে রক্তপাত ছাড়াই টিক্কা কাজটা করতে পারতেন।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে রাতভর অপারেশন সার্চলাইট প্রত্যক্ষ করে পরদিন ঢাকা ছাড়ার আগে এবং করাচিতে পৌঁছানোর পর সেনাবাহিনীর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে পাকিস্তান পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, ‘আল্লাহর অশেষ রহমত, পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে।’

১৯৭১ সালের ১৩ জুন দ্য সানডে টাইমস-এ ‘জেনোসাইড’ শিরোনামের এক কলামে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, ‘২৫ মার্চ সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী যখন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন তাদের অনেকের কাছেই হত্যার তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের নাম ছিল।’

২৮ মার্চ ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ শিরোনামে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমর্থনে অ-বাঙালি মুসলমানরা পরিকল্পিতভাবে গরিব মানুষের বসতিগুলোয় হামলা চালাচ্ছেন এবং বাঙালি ও হিন্দুদের হত্যা করছেন।’

বিশ্বের এই ভয়াবহ গণহত্যার আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতি

একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাত ও কয়েকদিন গণহত্যার চলায় মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দেয়। মানুষ আর ঘরে বসে না থেকে যে যেভাবে পারে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গ্রাম থেকে গ্রাম, শহর থেকে শহরে প্রতিরোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে।

পুলিশ, আনসার, ইপিআর—তারাও দলে দলে যোগদান করে মুক্তিযুদ্ধে। দেশের কৃষক, শ্রমিক ছাত্র জনতার সঙ্গে করাচি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, সেনাবাহিনীর কর্মকতারাও পালিয়ে এসে মুক্তিসংগ্রাম যুক্ত হন। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা বোনের ত্যাগের বিনিময় আমরা অর্জন করি স্বাধীন বাংলাদেশ।

৯ মাস ধরে যে হত্যাকাণ্ড পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজকারা, আলবদর, আল শামস ঘটিয়েছিল সেটার আজ পর্যন্ত আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতি নেই। স্বাধীনতার ৫৫ বছরের এই মাহিন্দ্রক্ষণে জোরোলো দাবি জানাই, সরকার এই ভয়াবহ গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা পদক্ষেপ নিক।

মার্কিন কংগ্রেসে স্বীকৃতির জন্য দাবি

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতির দাবিতে ২০ মার্চ ২০২৬ মার্কিন প্রতিনিধি সভায় একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতির মতো নৃশংসতার কথা উল্লেখ করে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রতিনিধি পরিষদে এইচ. আরইএস. ১১৩০ (H. RES. 1130)-এই রেফারেন্সে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন পরিষদের সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান। প্রস্তাবটি বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।

প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবগুলো:

(১) ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর চালানো নৃশংসতার নিন্দা জানাচ্ছে;

(২) স্বীকৃতি দিচ্ছে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের ‘ইসলামপন্থি’ সহযোগীরা ধর্ম ও লিঙ্গনির্বিশেষে জাতিগত বাঙালিদের নির্বিচার হত্যা; তাদের রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের হত্যা এবং হাজার হাজার নারীকে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য করেছেন। তারা বিশেষভাবে হিন্দু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ, ধর্মান্তরকরণ ও জোরপূর্বক বিতাড়নের লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন;

(৩) স্বীকৃতি দিচ্ছে যে, কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায় তাদের কোনো সদস্যের করা অপরাধের জন্য দায়ী নয়;

(৪) ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের সহযোগী ‘জামায়াতে ইসলামী’র পক্ষ থেকে জাতিগত বাঙালি হিন্দুদের ওপর চালানো নৃশংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।

একাত্তরের নৃশংস গণহত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জোরালো দাবির সঙ্গে কবি শামসুর রাহমানের কণ্ঠে উচ্চারিত করি—

‘আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ দিয়েছিল সেঁটে

মগজের কোষে কোষে যারা

পুঁতেছিল আমাদেরই আপনজনের লাশ

দগ্ধ, রক্তাপ্লুত,

যারা গণহত্যা করেছে

শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে খেত ও খামারে,

আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু

সেই সব পশুদের।’

তথ্যঋণ:

১। আমি বিজয় দেখেছি, এম আর আখতার মুকুল, অনন্যা, ১৯৮৫

২। আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওউন কান্ট্রি, খাদিম রাজা

৩। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, ৮ম খণ্ড, সম্পাদনা মফিজুল্লাহ কবির ও হাসান হাফিজুর রহমান হাসান হাফিজুর রহমান, হাক্কানী পাবলিশার্স

৪। ১৯৭১ : ঘাতক-দালালদের বক্তৃতা ও বিবৃতি, সাইদুজ্জামান রওশন, স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশন, ২০০১

৫। গণহত্যা’৭১, সম্পাদনা আবু সাঈদ, স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশন, ২০১৮

৬। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, রফিকুল ইসলাম, বীর উত্তম, অনন্যা প্রকাশী,১৯৮১

৭। একাত্তরের দিনগুলি, জাহানারা ইমাম ঢাকা: সন্ধানী প্রকাশনী, ১৯৮৬।

৮। মুক্তিযুদ্ধ কেন অনিবার্য ছিল ড.কামাল হোসেন ২য় সংস্করণ, ৭ম মুদ্রণ। ঢাকা: মওলা ব্রাদার্স, ২০১৪।

৯। মুক্তিযুদ্ধে রেডিও, গবেষণা ও সম্পাদনা আবু সাঈদ, স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশন, ২০১৮

১০। দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: দুই বন্ধু এক দেশ, আবু সাঈদ ও প্রিয়জিৎ দেবসরকার, স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশন, ২০২২

১১। একাত্তরের দিনলিপি, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান জয় প্রকাশন

১২। দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫-২২ মার্চ ১৯৭১।

১৩। দৈনিক পাকিস্তান, ১৫-২২ মার্চ ১৯৭১।

১৪। পূর্বদেশ, ১৫-২২ মার্চ ১৯৭১।

১৫। https://www.govinfo.gov/content/pkg/BILLS-119hres1130ih/pdf/BILLS-119hres1130ih.pdf

আবু সাঈদ : গবেষক ও প্রকাশক

 

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়