বৃহস্পতিবার, ৯ই এপ্রিল ২০২৬, ২৬শে চৈত্র ১৪৩২


মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি : অবসান, নাকি কৌশলগত বিরতি?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:২২

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং তার প্রেক্ষাপটে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক জটিল ও বহুমাত্রিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। প্রায় দেড় মাস ধরে চলা এই সংঘাত গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

বিশ্বব্যাপী এক ধরনের অনিশ্চয়তাও সৃষ্টি করেছে। এমন এক পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এই যুদ্ধবিরতি আদৌ স্থায়ী শান্তির সূচনা কিনা, নাকি এটি কেবল কৌশলগত এক বিরতি—তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

এই সংঘাতের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল নয়। বরং দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়েরই ধারাবাহিকতা।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আক্রমণে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বেও পরিবর্তনের খবর সামনে এসেছে। ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর মোজতবা খামেনির ক্ষমতায় আসায় ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই ধারণা করেছিল, ইরান দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, দেশটি প্রতিরোধ গড়ে তুলে সংঘাতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও এর পেছনে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক শিয়া মনস্তাত্ত্বিক কারণ। যার নেপথ্যে আছে ইমাম হোসেনের রক্তাক্ত ইতিহাস। তাইতো ইরান শেষ বিন্দু দিয়েই এই যুদ্ধ প্রতিহত করতে অনেকটা সমর্থ হয়েছে।

যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। এমনকি ‘একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’—এই ধরনের হুমকিও আন্তর্জাতিক পরিসরে উচ্চারিত হয়েছে বারবার। মার্কিন কৌশলগত বোমারু বিমান B-52 Stratofortress মোতায়েনের খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছিল।

অন্যদিকে ইরানও পাল্টা প্রতিরোধে প্রস্তুত ছিল। তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হয়েছে।

শুরুতে এই যুদ্ধ ইরান ও ইসরায়েল মধ্যে থাকলেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল উপসাগরীয় জিসিসি (গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল) ভুক্ত দেশগুলোতে। এরপর এতে যুক্ত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রথমে তার নেতৃত্বে আক্রমণে সফল হলেও দিন যত গেছে পরিস্থিতি ততই জটিল হয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, এত কোটি কোটি ডলার খরচ করে বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র কী পেল? রিজিম কি পরিবর্তন করতে পরেছে ইরানের? মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র কি তার বন্ধু দেশদের রক্ষা করতে পেরেছে? মার্কিন ঘাঁটিগুলো কি সুরক্ষিত রয়েছে? তেলের বাজার কি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে? গেরিলা নেটওয়ার্ক কি ভাঙতে সক্ষম হয়েছে?

তবে এই সংঘাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারা নিয়ে। এটা ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের ধাক্কাও ছিল। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতি আর ফিরে আসবে না এবং তারা নিজেদের শর্তে সমঝোতায় যেতে চায়।

এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠেছে। তারা ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থায় পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ। মার্কিন মুলুকে যুদ্ধবিরোধী জনমত দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
‘নো কিংস’ আন্দোলনের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। তাইতো এই আন্দোলন কেবল সাধারণ মানুষের ক্ষোভই প্রকাশ করেনি, বরং এটি রাজনৈতিক অঙ্গনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি রিপাবলিকান দলের ভেতরেও ভিন্নমত দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নির্বাচন এবং অর্থনৈতিক চাপ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। যুদ্ধের ব্যয়, শুল্কনীতির প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সবকিছু মিলিয়ে একটি নেতিবাচক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। যা ট্রাম্পকে হঠাৎ কৌশল পরিবর্তনে বাধ্য করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পেছনে কূটনৈতিক তৎপরতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার কথা বলা হলেও, বিশ্লেষকদের মতে চীনের ভূমিকা ছিল অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই (Wang Yi) একাধিক দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে রাশিয়াও কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিল। মজার বিষয় হলো, রাশিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব আটকে দিয়ে সংঘাতের গতিপথে প্রভাব ফেলেছে। যা মূলত বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির পথ সুগম করেছে।

যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, দুই সপ্তাহের জন্য সামরিক অভিযান স্থগিত রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে। ইরান শর্তসাপেক্ষে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে সম্মত হয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে জোর দিয়েছে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংসের যে বক্তব্য এসেছে, তা ভবিষ্যৎ উত্তেজনার ইঙ্গিত বহন করছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ইরানের লাভান দ্বীপে (Lavan Island) আক্রমণ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা হামলা প্রমাণ করে যে, বাস্তবে পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। এটি স্পষ্ট করে যে, এই যুদ্ধবিরতি একটি ভঙ্গুর সমঝোতা, যা যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

এই সংঘাতের অন্যতম প্রধান বাধা হলো আস্থার ঘাটতি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস এই ধরনের যেকোনো চুক্তিকে দুর্বল করে তুলেছে। তাছাড়া, এই সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আঞ্চলিক পক্ষগুলোর ভূমিকা এবং স্বার্থও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ফলে এখনই একটি টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন।

চীনের সক্রিয়তার পেছনে যে কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে, তাও উপেক্ষা করা যায় না। বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীন মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালী দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তাদের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দুর্বল করবে। যা চীনের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই চীন এই সংঘাত দ্রুত প্রশমিত করতে আগ্রহী ছিল।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণায় যে দেশগুলো ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করবে তাদের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। তা নতুন ধরনের অর্থনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজারগুলোর একটি এবং জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সেখানে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেলে এর সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি ও প্রবাসী শ্রমবাজারে পড়তে পারে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে ঘোষিত এই যুদ্ধবিরতি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এটি স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা নয়। বরং এটি একটি কৌশলগত বিরতি, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের সুযোগ নিচ্ছে। শক্তির রাজনীতি, কূটনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস—এই তিনটি উপাদান যতদিন বিদ্যমান থাকবে, ততদিন এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।

বিশ্ব এখন সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই অপেক্ষা করছে। এই বিরতি কি শান্তির পথে এগোবে, নাকি আরও বড় সংঘাতের সূচনা করবে। এটি এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাই হোক পৃথিবী যুদ্ধ মুক্ত হোক। শান্তির দিকে যাক এটি হোক আগামী দিনের প্রত্যাশা।

প্রশান্ত কুমার শীল : শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়