রবিবার, ১৪ই জুন ২০২৬, ৩১শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


স্বাস্থ্য বাজেট ২০২৬-২৭ : এখন প্রয়োজন জনমুখী বাস্তবায়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:১৪ জুন ২০২৬, ১৫:০৬

ছবি ‍: সংগৃহীত

ছবি ‍: সংগৃহীত

ঐতিহাসিক মাইলফলক। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ অতিক্রম করে ১.০১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়; বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুনভাবে বিনির্মাণের এক বিরল সুযোগ।

তবে স্বাস্থ্যখাতের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাজেটের আকারই শেষ কথা নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় করা যায় এবং তা জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।

গত অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে প্রাথমিকভাবে ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা পরে সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনতে হয়েছিল। কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করতে পারেনি। ফলে এবারও যদি বাস্তবায়ন সক্ষমতার সংকট কাটিয়ে ওঠা না যায়, তাহলে রেকর্ড বাজেট ঘোষণার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবে।

বর্তমান স্বাস্থ্য বাজেটকে মোটামুটি তিনটি অংশে ভাগ করা যায়।

প্রথমত, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য পরিচালন বাজেট;

দ্বিতীয়ত, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ;

এবং তৃতীয়ত, প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকার একটি বড় উন্নয়ন ব্লক বরাদ্দ, যা মূলত সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই তৃতীয় অংশটিই স্বাস্থ্যখাতে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা বহন করছে।

পরিচালন বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত সমস্যা বিদ্যমান। ওষুধ সরবরাহে বিলম্ব, স্থানীয়ভাবে ওষুধ ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়া, ক্রয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার ঘাটতি, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনীহা—এসব কারণে বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো এবং জাতীয় ইলেক্ট্রো-মেডিকেল যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রের মতো সহায়ক প্রতিষ্ঠানের দুর্বল সমন্বয়। ফলে হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, মেরামত, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা ক্রয় কার্যক্রম সময়মতো সম্পন্ন হয় না।

এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্য খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর জন্য ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে একটি বিশেষায়িত প্রকিউরমেন্ট হেল্পডেস্ক গঠন করা যেতে পারে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সমন্বয় সেল গঠন করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সমন্বিত করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাসপাতাল ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়নের পাশাপাশি জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। জনগণের সেবার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে ব্যর্থ হলে তার প্রশাসনিক দায়ও নিশ্চিত করতে হবে।

তবে এই বাজেটের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো উন্নয়ন ব্লক বরাদ্দকে জনকল্যাণমুখী ও ফলপ্রসূ কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করার সুযোগ। বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং সহায়ক কর্মীদের ঘাটতি স্বাস্থ্যসেবার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দ্রুত সময়ে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা গেলে হাসপাতালগুলোর সেবার মানে তাৎক্ষণিক উন্নতি আনা সম্ভব।

বাজেট বক্তৃতা এবং সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ইতিমধ্যে বেশকিছু অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি ও প্রকল্পের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন এবং শহরে ওয়ার্ডভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট, জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, ই-হেলথ কার্ড, জেলা-উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থার পুনর্গঠন, ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি এবং ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ।

এছাড়া, নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্যখাতের কাঠামোগত সংস্কার, সেবার সম্প্রসারণ এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি চিহ্নিত করা হয়েছে, যা বাজেট বাস্তবায়নের জন্য একটি নীতিগত দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মাতৃস্বাস্থ্য খাতেও একটি যুগান্তকারী কর্মসূচি গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ প্রসবের বিপরীতে এখনো ৩ থেকে ৪ হাজার মায়ের মৃত্যু ঘটে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রসব এখনো বাড়িতে হয়, যা মা ও নবজাতক উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের জন্য একটি সর্বজনীন মাতৃস্বাস্থ্য সেবা প্যাকেজ চালু করা যেতে পারে, যার আওতায় গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করা হবে। এর জন্য বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ দেশের মাতৃমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুহার কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে নগদ অর্থ প্রদান নয়, বরং সেবা নিশ্চিত করাই হবে মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেকটি বড় সংকট হলো বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়। ক্যানসার, কিডনি রোগ, হৃদরোগসহ ব্যয়বহুল অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৌশলগত ক্রয় পদ্ধতি চালু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য চিকিৎসা ব্যয়ের একটি সীমা নির্ধারণ করে দিতে পারে এবং সেই ব্যয় সরাসরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করতে পারে। এর মাধ্যমে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আর্থিক ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

সড়ক দুর্ঘটনাজনিত জরুরি চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও নতুন চিন্তার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল দুর্ঘটনার রোগী ভর্তি নিতে অনীহা প্রকাশ করে। সরকার যদি নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগ উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করে এবং চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধের নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে। জরুরি সেবার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।

সরকার ঘোষিত ই-হেলথ কার্ড উদ্যোগ স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে কেবল একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রদান করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন সম্ভব নয়। ই-হেলথ কার্ডের সঙ্গে যদি প্রতিটি পরিবার বা নাগরিকের জন্য নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য অধিকার এবং একটি সুস্পষ্ট আর্থিক সুবিধা-সীমা (বেনিফিট প্যাকেজ) যুক্ত করা যায়, তাহলে তারা সহজেই জানতে পারবেন কোন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।

এর ফলে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা অন্যান্য নির্ধারিত সেবা থেকে বঞ্চিত হলে রোগীরা জবাবদিহিতা দাবি করার এবং তাদের প্রাপ্য অধিকার আদায়ের নৈতিক ও আইনি ভিত্তি লাভ করবেন। তখন স্বাস্থ্যসেবা আর দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং তা নাগরিকের স্বীকৃত অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

এছাড়া, ই-হেলথ কার্ড পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আগেই সরকার প্রদত্ত ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা ও আর্থিক সুরক্ষার সীমা সংযুক্ত করে পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালুর সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন স্বাস্থ্য অধিকারভিত্তিক সেবা প্রদানের ভিত্তি তৈরি হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে একটি সর্বজনীন ও কার্যকর ই-হেলথ কার্ড ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই ধরনের অধিকারভিত্তিক স্বাস্থ্য অর্থায়ন স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে। জনগণ সেবা পাবে, হাসপাতালগুলো জবাবদিহিতার আওতায় আসবে এবং সরকারও জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের প্রকৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিফলন পরিমাপ করা সহজ হবে।

এই উন্নয়ন ব্লক বরাদ্দ থেকে সরকারি হাসপাতালগুলোর ডায়াগনস্টিক (ল্যাবরেটরি ও ইমেজিং) সেবার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) চালুর সুযোগও আছে। সুশাসন ও মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে জনগণ দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত ডায়াগনস্টিক সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রেকর্ড বাজেট নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন; কিন্তু এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে। যদি এই অর্থ দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করে জনবল সংকট দূর করা যায়, মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো যায় এবং নাগরিকের স্বাস্থ্য অধিকারকে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে এই বাজেট বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মোড় পরিবর্তনের সূচনা করবে। অন্যথায় এটি আরেকটি অপূর্ণ সম্ভাবনার গল্প হয়েই থেকে যাবে।

আজ তাই প্রশ্ন বাজেটের আকার নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই ঐতিহাসিক সুযোগকে একটি সত্যিকারের রোগীকেন্দ্রিক, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নির্মাণে কাজে লাগাতে পারব?

ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ : অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস, বাংলাদেশ

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়