বৃহস্পতিবার, ৩০শে এপ্রিল ২০২৬, ১৭ই বৈশাখ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
ফুটবলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আজ বৃহস্পতিবার ভ্যাঙ্কুভারে একত্র হচ্ছেন, যেখানে ফিফা আয়োজন করছে ৭৬তম কংগ্রেস। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দুই মাসের কম সময় আগে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, বিশ্বকাপ আয়োজনের লজিস্টিক জটিলতা এবং রাশিয়ার আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে কি না, এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েই আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এতে অংশ নিচ্ছেন ২০০টির বেশি সদস্য দেশের প্রায় ১ হাজার ৬০০ প্রতিনিধি।
তবে ইরানের অনুপস্থিতি ইতিমধ্যেই বৈঠকের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। কানাডায় পৌঁছানোর পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের (এফএফআইআরআই) কর্মকর্তারা হঠাৎই কানাডা ছেড়ে চলে যান এবং ভ্যাঙ্কুভারে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেন।
ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, এফএফআইআরআই সভাপতি মেহদি তাজসহ (যিনি আগে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির সদস্য ছিলেন) আরও দুই কর্মকর্তা কানাডার অভিবাসন কর্মকর্তাদের ‘অপমানজনক আচরণের’ কারণে দেশে ফিরে গেছেন।
ইরানের বদলে বিশ্বকাপে খেলার প্রস্তাবকে ‘লজ্জাজনক’ মনে করে ইতালি
মেহদি তাজ ছাড়া অন্য দুই কর্মকর্তা হচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত মোমবেনি ও তাঁর ডেপুটি হামেদ মোমেনি। অন্যদিকে কানাডা জানিয়েছে, ২০২৪ সালে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার পর ওই বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দেশটিতে প্রবেশে ‘অনুমোদন দেওয়া হয় না।’
কানাডার অভিবাসন সংস্থা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘গোপনীয়তা–সম্পর্কিত আইনের কারণে আমরা কোনো ব্যক্তিগত ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য করতে পারি না। তবে সরকার এ বিষয়ে শুরু থেকেই স্পষ্ট ও ধারাবাহিক অবস্থানে রয়েছে। আইআরজিসি–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কানাডায় প্রবেশের যোগ্য নন এবং আমাদের দেশে তাঁদের কোনো জায়গা নেই।’
এ ঘটনা ইরানের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। গত মাসে ইরানের ফুটবল কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, তাঁরা বিশ্বকাপে নিজেদের তিনটি গ্রুপ ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রের বদলে সহ-আয়োজক মেক্সিকোতে আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো দ্রুতই সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। ইনফান্তিনো বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ড্র অনুযায়ী ইরান যেখানে খেলার কথা, সেখানেই তারা বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলবে।
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত সপ্তাহে বলেন, ইরানের ফুটবলারদের টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্র স্বাগত জানাবে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইরানি প্রতিনিধিদলের যেসব সদস্যের আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে।
ট্রাম্পকে দেওয়া ফিফার শান্তি পুরস্কার বাতিলের দাবি নরওয়ে ফুটবলপ্রধানের
ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো বাড়তি চাপের মধ্যেই বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। বিশ্বকাপের টিকিটের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।
গত মঙ্গলবার ফিফা ঘোষণা দিয়েছে, বিশ্বকাপ থেকে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য আর্থিক বণ্টনের পরিমাণ বাড়িয়ে প্রায় ৯০ কোটি ডলার করা হয়েছে। গত ডিসেম্বরে এই অঙ্ক ধরা হয়েছিল ৭২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া একাধিক দল অভিযোগ করেছিল, ভ্রমণ ব্যয়, কর এবং সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এত বড় টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েও তাদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটেই ফিফার এই সিদ্ধান্ত এসেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ইনফান্তিনোর কাছে দাবি জানিয়েছে, তিনি যেন ফিফা কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে বিশ্বকাপ দর্শক, সাংবাদিক ও স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে স্পষ্ট আশ্বাস দেন। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে কেউ যেন নির্বিচার আটক, গণ বহিষ্কার বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর দমন–পীড়নের শিকার না হন, সে বিষয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক প্রধান স্টিভ ককবার্ন গতকাল বুধবার বলেন, ‘ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এখনো প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা দেননি, কীভাবে সমর্থক, সাংবাদিক ও স্থানীয় জনগণ নির্বিচার আটক, গণ বহিষ্কার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়ন থেকে নিরাপদ থাকবেন।’
এক বিবৃতিতে স্টিভ ককবার্ন আরও বলেন, ‘এই ফিফা কংগ্রেসই হওয়া উচিত সেই মুহূর্ত, যখন তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করবেন। বিশ্ব ফুটবল সম্প্রদায় শুধু ফাঁকা আশ্বাসের চেয়ে বেশি কিছু পাওয়ার অধিকার রাখে।’
এর মধ্যে ফিফার দেওয়া শান্তি পুরস্কার বাতিলের দাবিও উঠেছে। ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনো এই পুরস্কার ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন। নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিসে ক্লাভনেস এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এই পুরস্কার বাতিল দেখতে চাই। এমন কোনো পুরস্কার দেওয়া ফিফার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে আমরা মনে করি না।’
ফিফা কংগ্রেসে রাশিয়ার আন্তর্জাতিক ফুটবল নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই রাশিয়া আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে চলতি বছরের শুরুতে ইনফান্তিনো রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই রাশিয়াকে আবার ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞা কোনো ফল বয়ে আনেনি। বরং এটি শুধু আরও হতাশা ও ঘৃণা তৈরি করেছে।’
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)