শনিবার, ২৭শে জুন ২০২৬, ১৩ই আষাঢ় ১৪৩৩


জমে উঠেছে সাপাহার আমের হাট, ওজন ও দাম নিয়ে অস্বস্তিতে চাষিরা

নওগাঁ থেকে

প্রকাশিত:২৭ জুন ২০২৬, ১৮:০৭

ছবি ‍: সংগৃহীত

ছবি ‍: সংগৃহীত

ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে জমে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ আম বাজার নওগাঁর সাপাহার আমের হাট। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করেছেন বেপারি, পাইকার এবং ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে বাজারে ব্যানানা ম্যাংগো, বারি-৪, হাড়িভাঙা, ল্যাঙড়া এবং এই অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত আম আম্রপালি বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেজিতে আম ক্রয়-বিক্রয়ের নির্দেশনা দেওয়া হলেও মানা হচ্ছে না সেই নিদের্শনা। ৫২-৫৩ কেজিতে নেওয়া হচ্ছে এক মণ। দাম এবং বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্রেতা এবং বিক্রতাদের রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

শনিবার (২৭ জুন) সাপাহার আমের হাট ঘুরে দেখা যায়, সাপাহার তাজপুর পেট্রোল পাম্প এলাকা থেকে শুরু করে সাপাহার-নজিপুর আঞ্চলিক সড়কের গোডাউন পাড়া মোড় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সড়কের দুই পাশে বসেছে আমের হাট। ভোরের আলো ফোটার আগ থেকে চাষিরা ভ্যান, ভটভটি এবং অটোরিকশায় ক্যারেট সাজিয়ে বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারে নিয়ে আসছেন বিভিন্ন জাতের আম। দিনব্যাপী কেনাবেচা চলে এই হাটে। ক্রেতারাও দরদাম করছেন। ব্যবসায়ী এবং পাইকাররা সিন্ডিকেট করে প্রশাসন থেকে কেজিতে আমি ক্রয় করতে বললেও ৫২-৫৩ কেজিতে ১ মণ হিসেবে ক্রয় করছেন বলে অভিযোগ আম চাষিদের। ঢাকায়, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরে এখনো আমের চাহিদা নেই বলে বাজার কিছুটা দাম কম এবং লোকসানের মুখে আছেন বলে দাবি পাইকার, ব্যাপারী, এবং ব্যবসায়ীদের।

শনিবার সাপাহার আমের হাটে প্রতি মণ আম্রপালি ১৫০০-৪৫০০ টাকা, ল্যাংড়া ১৬০০-২৪০০ টাকা, ব্যানানা ম্যাংগো ২৭০০-৪০০০টাকা, হাড়িভাঙা ১৮০০-৩২০০ টাকা এবং বারি-৪ জাতের আম ১৬০০-২৪০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় চলতি মৌসুমে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। যা থেকে আম উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। গেল বছর জেলায় ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছিল , যা থেকে উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন আম।

বাজারে আম বিক্রি করতে আসা বিক্রেতা সাপাহার বাদদমদমা এলাকার আমচাষি নাসরুল্লাহ নাঈম বলেন, ৮ বিঘা জমিতে আম্রপালি আমের বাগান রয়েছে। বাজারে ২৮ ক্যারেট আম্রপালি আম বিক্রির জন্য সকালে নিয়ে এসেছি। পাইকাররা ওইভাবে দামই বলছেন না। গতবছর এ ধরনের আম ৩০০০-৩২০০ টাকায় বিক্রি করেছি। কিন্তু এ বছর ২৩০০-২৫০০ টাকার বেশি দাম কেউই বলছে না। যেদিন বাজারে আমের আমদানি বেশি হয় সেদিন ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে আমের দাম কমিয়ে দেন। এই দামে আম বিক্রি করে কীটনাশক খরচ উঠানোই কষ্টকর হয়ে যাবে।

জেলার পোরশা উপজেলার আমইড় গ্রাম থেকে আম বিক্রি করতে আসা আমচাষি মতিউর রহমান বলেন, আম বিক্রির আগে প্রশাসন থেকে বলা হয়েছিল কেজিতে আম বিক্রি হবে। কিন্তু বাজারে এসে দেখলাম বিক্রি হচ্ছে মণে তাও আবার ৫২-৫৩ কেজিতে এক মণ নেওয়া হচ্ছে। এমনিতেই এ বছর বাগানে আমের ফলন কম সঙ্গে দামও কম। তার ওপর যদি মণ প্রতি ১২-১৩ কেজি বেশি দিতে হয়, তাহলে আমরা যাবো কোথায়। বাজার যেন নিজের মতো করে চলছে। এখানে দেখার কেউ নাই। এখন আমাদের বাগান কেটে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নাই।

ঢাকার বাদামতলী থেকে আম ক্রয় করতে আসা ব্যবসায়ী আজাহার আলী বলেন, ৫-৬ বছর ধরে সাপাহারে আম কিনতে আসি। এ বছর মোকামে আমের চাহিদা কম। আম কিনতেছি ১০০ ক্যারেট নিচ্ছে ৫০ ক্যারেট। আমের চাহিদা না থাকায় বাজারে দাম কিছুটা কম। এ দামে আম কিনেও লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছ।

ভাই ভাই ফল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী রুহুল আমিন বলেন, কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করেই ৫২ কেজি নেওয়া হয়। ক্যারেটের সকল আম এক সাইজের হয় না। যার কারণে ব্যবসায়ীরা কৃষকদের সঙ্গে পরামর্শ করে কারও কাছ থেকে ৪৮ আবার কারও কাছ থেকে ৫০ কেজি নিয়ে থাকে। ওজন ৫২ তেই নির্দিষ্ট না।

সাপাহার উপজেলা আম আড়তদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত বলেন, এ বছর ঘন বৃষ্টির কারণে আমের কালার কিছুটা খারাপ হয়েছে। বেশিরভাগ বাগানির আমেই কালো দাগ রয়েছে। সারাদেশ থেকে ব্যবসায়ী এবং ব্যাপারীরা ইতোমধ্যে আসতে শুরু করেছেন। আশা করা যাচ্ছে এ বছর ৬-৭ হাজার কোটি টাকার আম কেনাবেচা হবে।

তিনি বলেন, প্রশাসন থেকে কেজিতে আম ক্রয়ের জন্য ব্যবসায়ীদের বলা হয়েছে। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং কানসাটের ব্যবসায়ীরা ৫০ থেকে ৫২ কজিতেই মণ হিসেবে আম ক্রয় করছেন। যার কারণে এ বাজারে আম ক্রয় করতে আসা ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। তাই ওজনের বিষয়টি যদি সারাদেশে একইরকম রাখা হয় তাহলে ব্যবসায়ীদের সুবিধা হবে। বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।

সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমানা রিয়াজ বলেন, বাজারে শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ৬টি ইউনিয়ন থেকে ১২ জন গ্রাম পুলিশকেও রাখা হয়েছে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। ওজনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়