রবিবার, ১০ই মে ২০২৬, ২৭শে বৈশাখ ১৪৩৩


৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয়ের দোতলা ভবন নির্মাণ, নেই ওঠার সিঁড়ি

রাজবাড়ী থেকে

প্রকাশিত:১০ মে ২০২৬, ১১:২৪

ছবি ‍: সংগৃহীত

ছবি ‍: সংগৃহীত

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার তালতলা সপ্তপল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবনির্মিত একাডেমিক ভবনটি এখন স্থানীয়দের কাছে এক ‘অদ্ভুত স্থাপত্যের’ নিদর্শন। বাইরে থেকে ঝকঝকে দোতলা ভবন দেখা গেলেও সেখানে ওঠার কোনো সিঁড়ি নেই। দীর্ঘ চার বছর আগে ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বর্ধিত এই দোতলা নির্মাণ করা হলেও সিঁড়ি না থাকায় তা কোনো কাজেই আসছে না। ফলে নতুন ভবন থাকা সত্ত্বেও শ্রেণিকক্ষ সংকটে নিচতলায় গাদাগাদি করে পাঠদান করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

​সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ২৩৫ শিক্ষার্থী রয়েছে। কক্ষ সংকটের কারণে নিচতলার মাত্র দুটি কক্ষকে বাঁশের চটা দিয়ে ভাগ করে চারটি অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ বানানো হয়েছে। সেখানে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গাদাগাদি করে বসছে। এতে পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বালিয়াকান্দি সদর উপজেলার তালতলা গ্রামে প্রায় ৬৬ শতক জমিতে ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি স্থাপিত হয় বিদ্যালয়টি। পরে আরও ১০ শতক জমি কিনে ৭৬ শতক জমিতে দুটি টিনের ঘরের একটিতে শিক্ষকদের বসার এবং অপর কক্ষে শ্রেণি পাঠদান চলে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে তিন কক্ষবিশিষ্ট একতলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হয়। এর একটিতে প্রধান শিক্ষক, অফিস সহকারী ও শিক্ষকদের বসার জায়গা এবং অপর কক্ষে কম্পিউটার ল্যাব চালু করা হয়। টিনশেড ঘর দুটিতে পাঠদান কার্যক্রম চালু রাখা হয়। বিদ্যালয়ের ২৩৫ শিক্ষার্থী পাঠদানের জন্য প্রধান শিক্ষকসহ ১২ জন শিক্ষক এবং ৬ জন কর্মচারী আছেন।

​বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে বিভিন্ন ধাপে জেলা পরিষদ ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অর্থায়নে এই ভবনটির কাজ শুরু হয়। প্রথম দফায় জেলা পরিষদ থেকে ৭ লাখ টাকা দ্বিতীয় দফায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে ১০ লাখ টাকা তৃতীয় দফায় জেলা পরিষদ থেকে ১০ লাখ টাকা সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে জেলা পরিষদের আরও ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দে দোতলার কক্ষ ও ছাদ নির্মাণ করা হয়।

​সব মিলিয়ে প্রায় ৩৭ লাখ টাকা খরচ করা হলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ভবনটিতে দোতলায় ওঠার জন্য কোনো সিঁড়ি রাখা হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার পর থেকে গত চার বছর ধরে এভাবেই পড়ে আছে ভবনটি।

​নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তন্ময় রায় আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের নতুন ভবন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সিঁড়ি না থাকায় আমরা সেখানে বসতে পারি না। এক রুমের মধ্যে বাঁশের বেড়া দিয়ে ভাগ করে আমাদের গাদাগাদি করে ক্লাস করতে হয়। গরমে সেখানে টেকা দায় হয়ে পড়ে।

বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী চৈত্র রায় বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের নতুন দোতলা ভবনটি তৈরি হয়েছে চার বছর হয়ে গেল। বাইরে থেকে এটি ঝকঝকে মনে হলেও ওপরে ওঠার কোনো রাস্তা নেই। আমরা ভেবেছিলাম নতুন ক্লাসরুম পাব, কিন্তু সিঁড়ি না থাকায় নিচতলায় আমাদের গাদাগাদি করে বসতে হয়।

অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সবুজ মণ্ডল বলেন, ভবনের দোতলায় ওঠার ব্যবস্থা নেই বলে অনেকগুলো শ্রেণিকক্ষ পড়ে আছে। আমাদের ক্লাসরুমের সংকট অনেক প্রকট। মাঝে মাঝে এক ক্লাসের ভেতর বাঁশের চাটাই দিয়ে ভাগ করে দুটি শ্রেণির ক্লাস নিতে হয়। অন্য ক্লাসের শব্দের জন্য আমরা পড়াশোনায় মন দিতে পারি না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দশম শ্রেণীর একজন ছাত্রী বলেন, সরকার এত টাকা খরচ করে ভবন করল, কিন্তু সেটা আমাদের কোনো কাজে আসছে না। সিঁড়ি না করে কীভাবে ভবন নির্মাণ শেষ হলো, সেটা আমাদের মাথায় আসে না। আমরা চাই দ্রুত সিঁড়ি তৈরি করা হোক যাতে আমরা ওপরের ফাঁকা রুমগুলোতে স্বাচ্ছন্দ্যে ক্লাস করতে পারি।

​বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তুষার কান্তি রায় বলেন, দোতলা ভবনটি এখন যে অবস্থায় আছে, তাতে অনায়াসেই ক্লাস নেওয়া যেত। কিন্তু সিঁড়ি না থাকায় আমরা সেখানে উঠতে পারছি না। আমরা দ্রুত এই সংকটের সমাধান চাই।

বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষিকা সমিতা বিশ্বাস বলেন, কক্ষসংকট দূর করতে জেলা পরিষদ ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে কয়েক দফা বরাদ্দ এনে দোতলা ভবনের কাজ করা হয়। দোতলায় দুটি শ্রেণিকক্ষসহ ছাদ সম্পন্ন হলেও সিঁড়ি না থাকায় সেটা কোনো কাজে আসছে না।

​বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণবন্ধু রায় বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জেলা পরিষদের অর্থায়নে ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রশাসনিক ভবনের পাশে প্রায় চার শতক জমিতে দোতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে আরও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ মিললে ভবনের নিচতলার দুটি কক্ষসহ আংশিক কাজ করা হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলা পরিষদ থেকে আবার ১০ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে নিচতলার কাজ সম্পন্ন করা হয়। কক্ষ স্বল্পতার কারণে নিচতলার দুটি কক্ষের ভেতর বাঁশের চাটাইয়ের বেড়া দিয়ে অস্থায়ী চারটি কক্ষ করে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয়।

​শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম এই পরিস্থিতির জন্য জেলা পরিষদের ঠিকাদারকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, জেলা পরিষদের ঠিকাদারের ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। বিষয়টি আগে আমাদের নজরে আসলে হয়তো এমন ভুল হতো না।

​অন্যদিকে, বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দের চাহিদা জানিয়ে আবেদন করা হয়েছে।

​রাজবাড়ী জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত প্রশাসক আবদুস সালাম মিয়া জানিয়েছেন, তিনি সবেমাত্র দায়িত্ব নিয়েছেন। ফাইলপত্র দেখে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তবে কতদিনে এই সিঁড়ি নির্মিত হবে আর শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য শ্রেণিকক্ষ ফিরে পাবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা মেলেনি।

 

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়