সোমবার, ১১ই মে ২০২৬, ২৮শে বৈশাখ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও কারসাজির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে সম্প্রতি এই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গঠিত টিম ইতোমধ্যে বিগত ১৫ বছরে নিয়োগ ও পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম, নিয়োগ বিধিমালা, নিয়োগ কমিটির বিস্তারিত প্রতিবেদনসহ অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করে বিটিআরসিকে চিঠি দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হওয়ায় দুদক টিম কাজ করছে বলে জানি। দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে অনুসন্ধান কাজ পরিচালনা করা হয়ে থাকে। এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি থাকলে পরবর্তীতে গণমাধ্যমে জানানো হবে।’
দুদক ও বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, বিটিআরসিতে গাড়িচালক থেকে শুরু করে পরিচালক, এমনকি কমিশনার ও পরামর্শক (কনসালটেন্ট) পদে নিয়োগেও আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। মঞ্জুরিবিহীন পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত পাঁচজন পরামর্শক এবং প্রকল্পে কর্মরত ২৫ জন কর্মকর্তার বয়স প্রমার্জন করে (ছাড় দিয়ে) নিয়োগ দেওয়া হয়। একজন কমিশনার পদে থেকে প্রায় তিন বছর অবৈধভাবে বেতন ও ভাতা সুবিধাও নিয়েছেন। ওই সময়কালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই প্রকল্পভিত্তিক কর্মরত ও জুনিয়র কনসালটেন্টদের অনেক পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এরপর ধীরে ধীরে তারা সিন্ডিকেট তৈরি করে নিয়োগ-পদোন্নতির ক্ষমতা নিজেদের হাতে নেয়। এমনকি কমিশনের লাইসেন্সিং শাখার মহাপরিচালক এবং দুই উপপরিচালক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে চাকরি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে এসব অভিযোগ তদন্তে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের একজন যুগ্মসচিবের নেতৃত্বে একটি বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটির প্রতিবেদনেও ২০০৯ সালে বিটিআরসিতে নিয়োগ পাওয়া ২৯ জন কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত ১৫ জনের নিয়োগে অনিয়ম খুঁজে পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তিন কর্মকর্তা নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। এছাড়া, আরও অন্তত ছয়জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও চাকরি বিধিমালা ভঙ্গের প্রমাণ উঠে এসেছে।
অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, ২০০৯ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত বিটিআরসির নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে অনিয়ম তদন্ত করতে কমিশনের লাইসেন্সিং শাখার মহাপরিচালককে প্রধান করে আরও একটি কমিটি গঠন করেছিল সংস্থাটি। সেই তদন্ত রিপোর্টেও প্রকল্পভিত্তিক কর্মরত ও জুনিয়র কনসালটেন্টদের কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। উপপরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতি পাওয়া তিন কর্মকর্তা ও ১৭ জন ড্রাইভার নিয়োগে অনিয়ম এবং রাজস্ব খাতের বিভিন্ন পদে জনবল কাঠামোবহির্ভূতভাবে নিয়োগের তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। এছাড়া, মঞ্জুরিবিহীন পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত পাঁচজন পরামর্শক এবং প্রকল্পে কর্মরত ২৫ জনকে বয়স প্রমার্জন করে নিয়োগ দেওয়ার তথ্য-উপাত্তও পাওয়া যায়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এই নিয়োগ ও পদোন্নতি ‘বিটিআরসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ২০০৯’ লঙ্ঘন করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিটিআরসি’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করে) বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিয়োগ, পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছে। নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। প্রকল্পভিত্তিক ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের ধাপে ধাপে রাজস্ব খাতে স্থায়ী করা হয়েছে। পরে তারাই প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় আপত্তি উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদেরই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামো ও জবাবদিহি ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। এমনকি ২০২৩ সালে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দপ্তর এক কমপ্লায়েন্স অডিটে বিটিআরসির নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের বিস্তৃত তথ্য প্রকাশ করলেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি; বরং অডিট আপত্তি এড়িয়ে অভিযুক্তদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।