মঙ্গলবার, ২রা জুন ২০২৬, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ফাইল ছবি
নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা সরবরাহ পর্যায়ে বড় ধরনের কর সুবিধা দিতে যাচ্ছে সরকার। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যায়ে আয়ের ওপর কর অব্যাহতি এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী হিসাবে কর রেয়াত পেতে পারে বলে জানা গেছে।
আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের বাজেটকে কেন্দ্র করে এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে সরকার।
মঙ্গলবার (০২ জুন) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর বিভাগের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবসায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্জিত আয়ের ওপর আয়কর অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে যা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, কর অব্যাহতি পেতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কিছু শর্ত মানতে হবে। নিজস্ব অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে এবং প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য নেট মিটারিং নির্দেশিকা-২০২৫ অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আয়কর আইন ২০২৩-এর আওতায় সব বিধান মেনে চলতে হবে।
কর সু্বিধা পেতে হলে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারীর মধ্যে সম্পাদিত নির্দিষ্ট পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (পিপিএ) অনুযায়ী ব্যবহারকারীকে সরবরাহ করতে হবে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থাকলে তা নেট-মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে হবে। তবে এখাতে উৎসে কর কর্তনের বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উৎসে কর কেটে তা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বিশেষ কর রেয়াত সুবিধা ঘোষণা করা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে, তাদের মোট ব্যবহৃত সৌরবিদ্যুতের বিপরীতে পরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের ৫ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ মোট প্রদেয় আয়করের বিপরীতে কর রেয়াত হিসেবে পাওয়া যাবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের পরও সৌর বিদ্যুতের বিভিন্ন উপকরণ আমদানি থেকে রাজস্ব আহরিত হয় বছরে ২০ কোটি টাকারও কম। যা সমগ্র রাজস্ব আয়ের খুব সামান্য অংশ। ২০২২-২০২৩ অর্থ বছর থেকে ২০২৪-২০২৫ বছর পর্যন্ত তিন বছরের পরিসংখ্যান বিবেচনা করলে দেখা যায়, রাজস্ব আয় হয়েছে সাড়ে ৫ থেকে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা। অথচ এটি দেশের সবুজ জ্বালানির পথে যাত্রার ক্ষেত্রে অনেক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনে ব্যবহৃত অধিকাংশ যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ থেকে শুরু করে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত করভার আরোপিত আছে। যা এই খাতের বিকাশে বড় বাধা।
এইচএস কোড হিসাবে দেখা যায়, সোলার পিভি মডিউল, ফোটোভোল্টাইক সেল এবং সোলার ইনভার্টারের মতো মূল যন্ত্রাংশে যথাক্রমে প্রায় ২৬.৯০ শতাংশ, ২৫.৭৫ শতাংশ এবং ২৮.৭৩ শতাংশ শুল্ক-কর বিদ্যমান রয়েছে। একইভাবে ডিসি কেবল ও মাউন্টিং স্ট্রাকচারের (অ্যালুমিনিয়াম) ওপর বিদ্যমান প্রায় ৫৮.৪০ শতাংশ শুল্ক-কর। এছাড়া সোলার প্ল্যান্ট পরিচালনায় ব্যবহৃত মনিটরিং ইউনিট বা ডাটা লগার, সার্কিট বোর্ড (বিএমএস) এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক পণ্যের ওপর বর্তমান ৩১ থেকে ৩৭ শতাংশের বেশি করহার রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারি প্যাক (রেডিমেড) ও ব্যাটারি সেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ওপরও ৫৮.৪০ শতাংশ শুল্ক-কর আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি কর আরোপিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে পিভি ডিজি কন্ট্রোলার বা হাইব্রিড কন্ট্রোলার, যার ওপর বর্তমান করভার প্রায় ৮৯.০৮ শতাংশ। উদ্যোক্তারা বলছেন, এই ধরনের উচ্চ করহার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে সাধারণ গ্রাহক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সদিচ্ছা থাকলেও এগিয়ে আসছে না।
এছাড়া সোলার প্ল্যান্টে ব্যবহৃত সেফটি অ্যালুমিনিয়াম ও ওয়াকওয়ে মেশের মতো অবকাঠামোগত উপকরণেও ৩৭.২৫ শতাংশ শুল্ক-কর বসানো হয়েছে। এর ফলে পুরো সিস্টেম স্থাপনের ব্যয় অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব যন্ত্রাংশে কর অব্যাহতিসহ অন্যান্য কর সুবিধা দেওয়া হলে দেশে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়বে, আমদানি নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমবে এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে। একই সঙ্গে শিল্প ও আবাসিক পর্যায়ে সোলার ব্যবহারের খরচ কমে আসায় বিনিয়োগও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।