সোমবার, ৮ই জুন ২০২৬, ২৫শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


পুশইন-পুশব্যাক: দুই দেশের সম্পর্কে নতুন ‘কাঁটা’!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:৮ জুন ২০২৬, ২০:১৪

ছবি ‍: সংগৃহীত

ছবি ‍: সংগৃহীত

ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে দফায় দফায় লোকজন ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। সীমান্তে এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে গত রোববার গভীর রাতে আরও একটি পুশ-ইন চেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। অন্যদিকে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের মশালগাঁও সীমান্তে জড়ো করা ব্যক্তিদের ভারতের ভেতরে সরিয়ে নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বিএসএফ।

এমন প্রেক্ষাপটের মধ্যেই ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিএসএফ ও বিজিবির মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতার বাইরে থাকা প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আরও ৮৩৬ জনকে হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে, যাদের সীমান্তের ওপারে ‘পুশ ব্যাক’ করা হবে।

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশে নতুন সরকারের অধীনে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চললেও সীমান্তে কেন হঠাৎ করে পুশ-ইন বাড়ছে? একই সঙ্গে সরকার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তার পানি বণ্টন ও গঙ্গা চুক্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ইস্যু সামনে রেখে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। সেই সময় সীমান্তে পুশ-ইনের ঘটনা আলোচনায় ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ হতে পারে।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, পুশ-ইন বন্ধে ভারতকে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, ‘ভারত সরকার যদি বিষয়গুলো সিরিয়াসলি নেয়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে।’

বিজিবির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থী যেকোনো পুশ-ইন প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।

পুশ-ইন হঠাৎ বাড়ল কেন

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক কিছুটা অবনতি হয়। ভিসা কার্যক্রম স্থগিত থাকা, রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য এবং সীমান্ত উত্তেজনা তখন পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ আবার শুরু হয়। উচ্চপর্যায়ের সফর, ফোনালাপ এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ে।

কিন্তু গত মাস থেকে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক পুশ-ইন চেষ্টা শুরু হলে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়। বিজিবি জানিয়েছে, একদিনে অন্তত ১০টি স্থানে এ ধরনের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে।

ঝিনাইদহ, যশোর, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা ও সিলেটসহ একাধিক সীমান্ত এলাকায় এসব ঘটনা ঘটেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিজিবিকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক সীমান্ত দিয়ে একই সময়ে পুশ-ইন প্রচেষ্টা স্বাভাবিক কূটনৈতিক আচরণ নয় এবং এর পেছনে ‘বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্য’ থাকতে পারে।

বিশেষ করে পানি বণ্টনসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে রেখে এটি চাপ সৃষ্টির কৌশল কি না—এ প্রশ্নও উঠছে।

কারও কারও মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রহের বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত ব্যবস্থার ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিষয়ে ভারত সরকারকে প্রমাণসহ তালিকা দিতে হবে।

তবে সীমান্তে পুশ-ইন অব্যাহত থাকলেও সরকারের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট কঠোর কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একাধিক চিঠি দিয়েছে এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদের মতে, এসব ঘটনা দুই দেশের চলমান সম্পর্ক উন্নয়ন প্রচেষ্টার জন্য চাপ তৈরি করছে। তার মতে, তিস্তা ও গঙ্গা চুক্তিসহ নানা ইস্যুতে আলোচনার আগে এটি একটি সংকেত হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিনও মনে করেন, সীমান্তে হঠাৎ করে পুশ-ইন বৃদ্ধি বিস্ময়কর। তার মতে, এটি বৃহত্তর কূটনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হতে পারে।

পুশ-ইন কি সম্পর্ক উন্নয়নে বাধা হবে?

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, প্রতিটি ঘটনা আলাদা হলেও সীমান্ত ইস্যু গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা জরুরি। তার মতে, দুই দেশের বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

তিনি জানান, সম্প্রতি চেন্নাই থেকে ৩৪ জন বাংলাদেশিকে ফেরত আনা হয়েছে।

তার ভাষায়, ‘যদি বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো অবৈধ নাগরিক থাকে, তাহলে বিদ্যমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের ফেরত পাঠানো উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘যত রকম ডিপ্লোম্যাটিক নর্ম আছে, আমরা তা অনুসরণ করছি। ভারতকে আমরা চিঠি দিচ্ছি এবং আশা করি তারা বিষয়টি গুরুত্ব দেবে।’

প্রতিমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, পুশ-ইনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান না হয়ে বরং দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে বিদ্যমান কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে সমাধানের ওপরই তিনি গুরুত্ব দেন।

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়