শনিবার, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৬, ২১শে চৈত্র ১৪৩২


জ্বালানি-দুশ্চিন্তা ও তথ্যের প্রবাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৯

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

এই মুহূর্তে দেশ এক অদ্ভুত জ্বালানি-আতঙ্কে ভুগছে। ‘অদ্ভুত’ কারণ কোনো কিছু থেমে নেই। গাড়ি চলছে, দূরপাল্লার বাস, ট্রেন, সরবরাহ বহনকারী বাল্কহেড নৌযান চলছে। বাজার সরগরম, কোথাও তেমন অভাব-অভিযোগ নেই, কেবল দাম বিষয়ে অস্বস্তি ছাড়া।

তা এই অস্বস্তি বাংলার ঐতিহ্যগত। কিন্তু বিপদ দেখা দেবে যখন আপনি কোনো ফিলিং স্টেশনের পাশ দিয়ে যাবেন। দেখা যাবে, সারি সারি মোটরসাইকেল, গাড়ি ইত্যাদি দাঁড়িয়ে আছে, তেল নেওয়ার জন্য। যে-সে সারি নয়, মাইলখানেক লম্বা সারি কিংবা বাইকের বিশাল জটলা দেখা যাচ্ছে।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জানা যাচ্ছে, তেলের কোনো ঘাটতি নেই, সরবরাহ কম হলেও, কিংবা হরমুজ প্রণালিতে স্মরণকালের বৃহত্তম যুদ্ধ-পরিস্থিতি বজায় থাকলেও। সরকার বলছে, শুধু আগামীতে যাতে বিপদে না পড়তে হয়, সেইজন্য সাবধানী র‍্যাশনিং চলছে।

আসন্ন ঈদ উপলক্ষে গৃহের মধ্যবিত্ত কর্তা যেমন বাজারে সদা-তৎপর নজর রাখেন, বা সব ‘বাজে খরচ’ বন্ধ রাখেন, তেমনি। কিন্তু আমজনতা ভীত হয়ে পড়েছে। বাইকে তেল থাকবে না, কিংবা চলতে চলতে থেমে যাবে এবং তখন ফিলিং স্টেশনে তেল থাকবে না - এই চিন্তা মধ্যবিত্ত করোটিতে ভয়ানক ভূমিকম্প দেয়, দুশ্চিন্তিত ক্লস্ট্রোফোবিয়া দেয়।

এই ফোবিয়া জান্তব, ভয়াবহ, অস্থিতিশীল এবং মানুষকে ভীষণ অস্থির করে তোলে। এই অস্থিরতা আমরা ইদানীংকালের ফিলিং স্টেশনে মারামারিতে দেখেছি। একইসাথে তৎপর হয়েছে বাংলার বিখ্যাত সুযোগসন্ধানী ও মজুতদারেরাও। তারা ছলে-বলে-কৌশলে তেল মজুত করছে-একই বাইক বারবার তেল নিতে ফিলিং স্টেশনে যাচ্ছে, তেলের লরি থেকে মাঝপথেই তেল উধাও হচ্ছে, ‘তেল নাই’ লেখা ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালিয়ে কর্মকর্তারা দেখছেন তেল ঠিকই আছে। এই ঘটনাসমূহই বাঙালি চিত্তকুলের ভীষণ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত প্রপঞ্চের মূলে। 

স্বাভাবিক যে, মাঠে-ঘাটে-আফিসে তেল-চিন্তাই বাঙালির ঘুম কেড়ে নিয়েছে। চালকেরা অস্থির হয়ে উঠছেন, ঢাকা শহরে তেল নিতে ২-৪ ঘণ্টা, কখনো আবার ৪-৫ ঘণ্টা লাইন দিতে হচ্ছে। ঈদের আগে লাইন ছোট ছিল, তেলের পরিমাণ বেধে দেওয়া ছিল। ঈদযাত্রা যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য সরকারের পক্ষ নানা খবরদারি ও নজরদারি ছিল।

ফলে ঈদযাত্রা নিশ্চিন্ত থেকেছে, যদিও সুপ্রচুর দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি (প্রায় ৩০০ নিহত) এই ঈদযাত্রাকে দুঃখাতুর করেছে, কিন্তু জ্বালানি-দুশ্চিন্তিত রাখেনি। ঈদের পর, র‍্যাশনিং উঠে গেল, যে যত চাচ্ছে তত পাচ্ছে, কিন্তু বাইকে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

মফস্বলে গিয়ে দেখেছি, গ্রামাঞ্চলের প্রধান বাহন ও গ্রামীণ অর্থনীতির কমিউনিকেশন ব্লাডলাইন এখন বাইক। শহরে ও ফিলিং স্টেশনে বাইকের বিশাল বহর তেল নিতে বদ্ধ-পরিকর। সেখানে আবার জায়গা-বুঝে সরকারি বাইকের সারি, দলীয় বাইকের সারি এবং সাধারণ বাইকের লম্বা সারি দৃশ্যমান। যদিও ব্যক্তিগত গাড়িতে ট্যাংক ভরে তেল নেওয়া যাচ্ছে, কিন্তু বিশাল লম্বা সারি যেকোনো চালক ও গাড়িমালিককে চিন্তিত রাখছে।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, আমাদের তরল জ্বালানি-অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন-আছে কতটুকু। আমরা কত আমদানি করি, কত ব্যবহার করি, প্রতি মাসে গড়ে কত ব্যবহার হয়, আমাদের ডিজেলের চাহিদা কত, আমদানির কতখানি অপরিশোধিত বা ক্রুড, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তার কী পরিমাণ শোধন হয় প্রতিদিন, তারপর বিতরণের ডিলারদের কাছে কতখানি যায়, আমাদের পেট্রোল কতখানি কিনতে হয় আর কতখানি গ্যাস-কনডেনসেট থেকে তৈরি করা যায়, একইকথা অকটেনের জন্যেও প্রযোজ্য, অকটেন কতখানি আমদানি করতে হয়, নাকি নিজেরা বানাতে পারি, ইত্যাদি।

এই প্রায় ১২টি কলাম ও ৬টি সারি সমৃদ্ধ তথ্যের সারণি আমরা কোথাও দেখি না। সরকারের কাছে কি আদৌ এই ডেটা আছে? যা আছে সেটা কি আদৌ পরিশ্রুত ডেটা? এটা কি দৈনিক ডেটা, নাকি ২/৩ দিনের গড় ডেটা? আসলে জ্বালানি-খাতের ডেটা কোথায় পাওয়া যাবে?

এই প্রশ্নগুলো নিয়েই কিছুদিন আগে কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ অধ্যাপকদের সাথে এক ঘরোয়া আড্ডায় কথা হচ্ছিল। এই তথ্যসারণিটি না-থাকায় আমাদের সিদ্ধান্তগুলো তথ্য-ভিত্তিক হচ্ছে না। ‘ভয় নাই, জ্বালানি আছে’-এ কথা সত্যি কিনা, কিংবা ‘জ্বালানি থাকলে, ফিলিং স্টেশনে লাইন কেন’ এই প্রশ্নের সত্যিকার জবাব, অথবা ‘দাম কমালে মজুতদারি বা চোরাচালানি বন্ধ হবে’-এই সিদ্ধান্ত সঠিক কিনা-এসব যাচাইয়ের জন্য যে-তথ্য থাকা দরকার ছিল—রিয়েল টাইম এনার্জি ফ্লো ডেটা- সেটা আপাতদৃষ্টিতে আমাদের নাই।

কেন নাই? আমার মনে পড়ে গেল, তিন বছর আগে, গত সরকারের আগের সরকারের সময়কার জ্বালানি মন্ত্রীকে বুয়েটের জ্বালানি ইন্সটিটিউটের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, আমাদের একটা তথ্যভাণ্ডারের প্রয়োজন আছে যা রিয়াল-টাইমে সারা দেশের জ্বালানি-প্রবাহকে মনিটর করবে।

প্রতিদিন কোন পাইপ দিয়ে কত তেল যাচ্ছে, কোন পাইপে কত গ্যাস বিতরণ হচ্ছে, কোন স্টোরেজে কত তেল বা এলএনজি আছে-এইসব আমি এক লহমায় দেখতে পারব। মোট কথা, আমাদের একটা জ্বালানি ডেটা-সেন্টার লাগবে এবং বুয়েটে আমরা এটা হোস্ট করতে পারি, শুধু সরকার মহোদয়ের অনুমতি, অংশগ্রহণ, ফান্ডিং ও নীতিগত অনুমোদন প্রয়োজন।

এতে করে তথ্য-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত-গ্রহণ, সংখ্যায়নিক বিশ্লেষণ এবং মডেল-ভিত্তিক সিমুলেশন ও ফোরকাস্টিং সম্ভব হবে। আমাদের বাস্তবভিত্তিক দরদাম ও খরচ বিশ্লেষণ (কস্ট এনালিসিস ও ইকোনোমেট্রিক মডেলিং) সম্ভব হবে, আমাদের আমদানি খরচা ও ভর্তুকির ভারসাম্য আনা বুদ্ধিবৃত্তিক হবে, ইত্যাদি।

মন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার ডেটা আমি আপনাকে দেব কেন?’ এই প্রশ্ন শুনে আমি ভড়কে গেলাম। উপস্থিত অন্যরাও ভাষা হারিয়ে ফেললেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি-চিন্তক বোঝানোর চেষ্টা করলেন, না ডেটা তো লাগবেই, আর সব ডেটা তো পাবলিক ডিসপ্লেতে থাকবে না।

আমি যোগ করলাম, যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন যেমন চমৎকার এনার্জি ডেটাবেজ রাখে, সেখানে তো আমরাই দেখতে পারি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির প্রবাহ কেমন, তাতে ওদের তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না, তাহলে আমাদের জাতীয় সমস্যা কোথায়। যাই হোক, মন্ত্রী এসবের ধার ধারলেন না। তথ্যের প্রবাহ, অবাধ না হোক, বাধ্যগত প্রবাহেও তারা রাজি নন।

কোনো সরকার কি আদৌ এই তথ্য-প্রবাহে খোলা মনে রাজি থাকেন? কেন থাকেন না? তথ্য থাকলে তো বিশ্লেষণে, সিদ্ধান্ত-গ্রহণে স্পষ্ট সুরাহা হয়, কোনো অস্পষ্টতার প্রয়োজন থাকে না, ফিলিং স্টেশনে লাইন দিতে হয় না। কিন্তু তবু আমরা তথ্যকে এড়িয়ে হিউরিস্টিক ও এডহক সমাধানে ব্রতী হই। এগুলো হোমিও ওষুধের মত ফেইথ-হিলিং করে, ক্ষণিকের টোটকা-জাতীয় সমাধান, দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধানই নয়।

আমাদের জ্বালানি-নিরাপত্তার মূল কথাই হলো আমদানি নির্ভরতা। তিক্ত শোনালেও এ কথা মেনে নিতে হবে। আপাতত। ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম-জ্বালানি নির্ভরতা আমাদের অর্থনীতি ও জীবন-নির্বাহের এক মূলসূত্র। এই সূত্র গভীর, জালের মতো বিস্তৃত, ভূ-রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত।

দেশের সব সরবরাহ-লাইন-ট্রাক, বাস, ট্রেন, বৃহৎ নৌযান, জাহাজ-সবই ডিজেল-চালিত। এদের রাতারাতি ইলেকট্রিক ভেহিকেল করা যাবে না। এটাই এখনকার বাস্তবতা। এখান থেকে বেরুতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরমাণু বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকতে হবে। কিন্তু এই ট্রানজিশন করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন।

আমাদের হাতে বিকল্প আছে সৌরবিদ্যুৎ, কিছুটা বায়ুবিদ্যুৎ। এছাড়া বায়োডিজেল বা হাইড্রোজেন-জ্বালানির যেসব বিকল্পের কথা শোনা যায়, সেসব বাস্তবসম্মত নয়, অন্তত এখুনি।

আমাদের মতো কৃষিপ্রধান দেশে বায়োডিজেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে প্রয়োজন অন্তত তিন বছরের মাঠ-সমীক্ষা-এক টন বায়োডিজেল দিতে কত একর জমিতে আখ/ভুট্টার চাষ করতে হবে, তাতে কী পরিমাণ সার ও ডিজেল-চালিত পানিসেচ করতে হবে, কতদিনে সে-শস্য থেকে আমরা এথানল পাব, কত পরিমাণ পাব, তার বিশুদ্ধতা কত হবে, তাকে একটা নির্দিষ্ট জ্বালানি-গ্রেডে উন্নীত করতে কী পরিমাণ রাসায়নিক সংশ্লেষ প্রয়োজন হবে এবং কী পরিমাণ জ্বালানি লাগবে, ওই জমিতে বছরের অন্য সময়ে কী শস্যের ফলন হবে, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন আছে, যার বাস্তব-ভিত্তিক তথ্যের প্রয়োজন, ডেস্ক-ক্যালকুলেশন নয়।

হাইড্রোজেন কিন্তু জ্বালানি-বাহক, ইলেকট্রিসিটির মতো, তাকে অন্য জ্বালানি খরচ করে তৈরি করতে হয়, তবেই না সে জ্বালানি হিসেবে কাজ করতে পারবে। আমাদের জ্বালানি-ঘনত্বের কথাও চিন্তা করতে হবে। উল্লম্ফনবাদীদের অবাস্তব চিন্তায় মশগুল না হয়ে, হাতেকলমে পরীক্ষা করে দেখতে হবে বাংলাদেশের ভূগোল ও জলবায়ু কী পরিমাণ সৌর বা বায়ুবিদ্যুৎ দিতে সক্ষম বা বায়োডিজেল ইত্যাদি বাস্তবসম্মত কিনা। হয়তো ভবিষ্যতের গবেষণা এসব সমাধান করবে, নিশ্চয় করবে, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি জ্বালানি-নিরাপত্তার কোনো সুমাধান নেই।

অতএব, জ্বালানি-চিন্তায় সঠিক তথ্য ও বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারের এখনই প্রয়োজন হবে একটি এনার্জি ডেটাসেন্টার নিয়ে কাজ করার। আগেও বলেছি, আবারও বলছি, এমন এক ডেটাসেন্টারে আমাদের কিছু শক্তিশালী এনার্জি মডেলিংয়ের প্রয়োজন হবে যা ফোরকাস্টিং ও ইকোনমিক মডেল নির্মাণে আমাদের সাহায্য করবে।

আমাদের একটা শক্তিশালী আমলা-বিবর্জিত টাস্কফোর্স প্রয়োজন যারা এই গবেষণা বা আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতি নজর রাখবেন, ভূ-রাজনীতির বঙ্কিম পথরেখায় ওয়াকিবহাল থাকবেন। জ্বালানি-দুশ্চিন্তা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, হরমুজ প্রণালিতে যাই ঘটুক না কেন, দেশে অস্থিতির পরিস্থিতি তৈরি হবে।

মানুষের ধৈর্য অসীম নয় এবং ফিলিং স্টেশনের ভিড় নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে সরকারকে খেসারত দিতে হতে পারে। ফিলিং স্টেশনের ভিড় নিয়ন্ত্রণ কেবল স্থানীয় প্রশাসনের কাজ নয়, এতে প্রয়োজন স্থিতধী বুদ্ধিমত্তা, রাজনৈতিক কৌশল এবং তথ্য-ভিত্তিক সিদ্ধান্তগ্রহণ।

ফুয়েল কার্ড বা যে-কার্ডই আনুন না কেন, তথ্যের সঠিক প্রবাহ সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে এবং মানুষের দুশ্চিন্তাকে প্রশমিত করে। নাগরিক যদি দুশ্চিন্তিত থাকেন, তাহলে সেটা দেশের মাথাব্যথার কারণ হবে। ফিলিং স্টেশনের ভিড় হয়তো একদিন মিলিয়ে যাবে, কিন্তু মাথা কেটে মাথার সমস্যার সমাধান করা যাবে না। 

ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী : অধ্যাপক, তড়িৎকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়