বৃহস্পতিবার, ৭ই মে ২০২৬, ২৪শে বৈশাখ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বব্যাপী সম্পদের স্বল্পতা ও সংঘাতের মধ্যে একটি সুসংহত তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করেন প্রখ্যাত কানাডীয় অধ্যাপক টমাস হোমার-ডিক্সন। তিনি তার যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘এনভায়রনমেন্ট, স্ক্রেসিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স’-এ (১৯৯৯) যুক্তি দেন, পরিবেশগত সম্পদের স্বল্পতা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে, যা বিদ্রোহ, জাতিগত দাঙ্গা ও শহুরে অস্থিরতার মতো সহিংসতার রূপ নিতে পারে।
হোমার-ডিক্সন সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেন যে, সম্পদের স্বল্পতা ও সহিংসতার মধ্যে সম্পর্কটি প্রত্যক্ষ না হয়ে অত্যন্ত জটিল এবং এটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে মিলিত হয়ে কাজ করে। এই তাত্ত্বিক কাঠামোটি কেবল একাডেমিক আবিষ্কার নয়, বরং বাংলাদেশের মতো সম্পদ-নির্ভর ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশের বর্তমান সংকট বোঝার জন্য একটি অপরিহার্য বিশ্লেষণী হাতিয়ার।
হোমার-ডিক্সন সম্পদের স্বল্পতাকে তিনটি স্বতন্ত্র ভাগে বিভক্ত করেছেন: চাহিদাজনিত স্বল্পতা, জোগানজনিত স্বল্পতা এবং কাঠামোগত স্বল্পতা।
চাহিদাজনিত স্বল্পতা সৃষ্টি হয় যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা মানুষের ভোগের চাহিদা সম্পদের জোগানের তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, জোগানজনিত স্বল্পতা আসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন বা সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কারণে সরবরাহ কমে গেলে। তিনি এই তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করার জন্য মেক্সিকোর চিয়াপাস এবং বিভিন্ন আফ্রিকান ও এশীয় দেশের দ্বন্দ্বের উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে পরিবেশগত স্বল্পতা ইতিমধ্যেই সহিংসতার জন্য দায়ী।
তবে, উন্নয়নশীল দেশের অস্থিরতার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী হলো তৃতীয় ও সবচেয়ে জটিল রূপ—কাঠামোগত স্বল্পতা। এটি তৈরি হয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা। যাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকে, তারা সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থা নিজেদের পক্ষে সাজিয়ে নেয়, যার ফলে সমাজের অধিকাংশ মানুষ ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, গবেষকরা হোমার-ডিক্সনের এই কাঠামোটি সফলভাবে প্রয়োগ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় রোহিঙ্গা সংকট ও কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা বিশ্লেষণ করতে এই মডেল ব্যবহার করা হয়। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের (সিএইচটি) ভূমি ও সম্পদ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতও এই তত্ত্বের মাধ্যমেই ব্যাখ্যা করা যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহে ব্যাঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এমনভাবে প্রভাবিত করছে, যা হোমার-ডিক্সনের স্বল্পতার তিনটি প্রকারেরই বাস্তব নিদর্শন বহন করে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জ্বালানি তেল সংকট, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চরম আকার ধারণ করে, স্বল্পতার তত্ত্বের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
প্রথমত, চাহিদাজনিত স্বল্পতা স্পষ্ট। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে দেশের জ্বালানি তেলের ব্যবহার অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের সূত্রে দেখা যায় মোট তেল ব্যবহার ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রায় ৫৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, যা মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ।
এই চাহিদার বিপরীতে দেশের স্টোরেজ সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। আন্তর্জাতিক আদর্শ যেখানে ৯০ দিনের মজুদের সুপারিশ করে, সেখানে বাংলাদেশ গড়ে ৪০ দিনেরও কম সময়ের জ্বালানি মজুদ রাখতে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের মজুদ কখনো কখনো মাত্র ১০ দিনের নিচে নেমে গেছে, যা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এই বিপুল চাহিদা ও দুর্বল সক্ষমতার মধ্যেই যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ জোগানজনিত স্বল্পতা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করে এমন গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি করুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং কিছু সময়ের জন্য তা ১৪০ থেকে ১৫০ ডলারে পৌঁছে যায়, যা ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বাংলাদেশ, যেটি তার শক্তির ৯৫ শতাংশই আমদানি করে, এই ধাক্কায় বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি পড়ে। এলএনজির দাম একক প্রতি ১২ ডলার থেকে বেড়ে ২৮ ডলারে পৌঁছায় এবং দেশকে জ্বালানি আমদানির জন্য প্রতিমাসে অতিরিক্ত প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছিল। এমনকি বৈদেশিক বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েও সংকট দূর করা যাচ্ছিল না।
তবে হোমার-ডিক্সনের তত্ত্বানুযায়ী যেটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা তা হলো কাঠামোগত স্বল্পতা। বিদ্যমান সংকটের একটি বড় কারণ ছিল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের শৃঙ্খলা। মার্চ মাসে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত থাকা সত্ত্বেও দেশীয় বাজারে এপ্রিলের জন্য দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এশিয়া টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নয়। এর ফলে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি হয়, একদিকে ভোক্তারা ভবিষ্যৎ দাম বৃদ্ধির আতঙ্কে অযথা জ্বালানি মজুদ শুরু করেন, অন্যদিকে ডিলাররা লাভের আশায় পাম্পে তেল না দিয়ে তা আটকে রাখেন বা কালোবাজারে বিক্রি করেন। এই অস্থিরতার সুযোগে কালোবাজারিরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অভিযোগ ওঠে, কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মজুদ করছে। মোবাইল কোর্টের অভিযানে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ লিটার অবৈধ মজুদকৃত জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়।
সরকারের সদস্যরাও এটিকে ‘কৃত্রিম সংকট’ বলে অভিহিত করলেও, এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত লাইন ও সংকট অব্যাহত থাকে। অবশেষে ১৯ এপ্রিল সরকার দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হয়, কিন্তু ততদিনে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে সাধারণ মানুষ কিংবা শিল্পখাতের ক্ষতি আর ফেরানো যায় না।
উৎপাদনখাত ও সাধারণ ভোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়, যা জনঅসন্তোষ ও সংঘাতের বীজ বপন করে। সারা দেশে ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি সংগ্রহ করতে দীর্ঘ লাইন এবং কিছু মানুষের রীতিমতো সংঘাতের ঘটনা দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানী ঢাকাতে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ৫-৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সেই খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। সিমেন্ট, ইস্পাত ও সিরামিকের মতো শিল্পগুলো চাপে পড়ে যায়।
সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ে কৃষি খাতে। বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ নির্ভর করে ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর। বোরো মৌসুমে ডিজেল সংকট ও দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক এলাকায় সঠিক সময়ে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়নি, যা উৎপাদনকে হুমকির মুখে ফেলে। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধির এই চক্র বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরবরাহ-জনিত মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করে, যা উচ্চ বিত্তশালী থেকে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। গবেষকেরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ থামলেও জ্বালানি ও কমোডিটির বর্ধিত মূল্যস্ফীতি থেকে বেরোতে বাংলাদেশের কমপক্ষে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবে।
হোমার-ডিক্সন যেমন বলেছেন, সম্পদের স্বল্পতা নিজে থেকে যুদ্ধ বা দাঙ্গা তৈরি করে না বরং এটি সামাজিক কাঠামোর বিদ্যমান ফাটলগুলো প্রশস্ত করে তোলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। চাহিদা, জোগান ও কাঠামোগত স্বল্পতার এই ধাক্কা সামলাতে গিয়ে শিল্প-কৃষি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন যাতায়াতের সংকট দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছে। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে প্রথমত, ব্যক্তিগত হতাশা ও দুর্ভোগের নানামুখী রূপে এবং সবশেষে তা গণঅস্থিরতা ও সহিংস সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল জুড়ে বাংলাদেশের নাগরিক জীবন যেন এক চরম যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়। কেবল পেট্রোল পাম্পের সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারিই ছিল না বরং এই সংকটের দহনজ্বালা পৌঁছেছিল মানুষের হৃদয়ে, কর্মস্থলে ও সংসারে। প্রথম আঘাতটি আসে সময়ের অপচয় ও সীমাহীন দুর্ভোগ নিয়ে।
চট্টগ্রাম বন্দরে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত জাহাজ ভিড়লেও, পাম্পগুলোর সামনে ‘আতঙ্কিত ক্রয়ের’ (প্যানিক বাইং) দৃশ্য প্রতিদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়। প্রশাসনের একাধিক বৈঠক সত্ত্বেও পাম্পে তেলের জোগান নিয়মিত হয়নি। রাজধানীর ফিলিং স্টেশনের সামনে তখন যানবাহনের সারি প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ ছিল। বাইকে কিংবা গাড়িতে সারাদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা এক টানাপড়েনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে দেখা যায়, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও’ তেল পাননি অনেকেই।
দ্বিতীয়ত, হতাশার এই আগুন ধীরে ধীরে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যেই অন্তত ২৫ জন জ্বালানি সংক্রান্ত দ্বন্দ্বে প্রাণ হারিয়েছেন বলে সংসদে তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ঝিনাইদহে এক ব্যক্তি ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের সঙ্গে তেল নিয়ে ঝগড়ার পর নিহত হন এবং উত্তেজিত জনতা সেখানে তিনটি বাসে অগ্নিসংযোগ করে। আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে নড়াইলে, যেখানে তেল বিতরণ নিয়ে তর্কের জেরে এক ট্রাক চালক পাম্প ম্যানেজার নাহিদ সরদারকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করেন। এই ঘটনায় পাম্প মালিক ও শ্রমিকরা প্রতিবাদে ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে দেন এবং জনরোষ ছড়িয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, ধাক্কাটি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবিকা ও চাকরির ওপর আঘাত হানে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে সড়ক পরিবহন ও জ্বালানি নির্ভর শিল্পই মেরুদণ্ড, সেখানে ইস্পাত শিল্পের দৈত্য বিএসআরএম প্রতিদিন ৩৫ হাজার লিটার ডিজেল পেত, যা সংকটের সময় নেমে আসে মাত্র ৯ হাজার লিটারে, যার ফলে তাদের ‘উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছিল’। এই খবর শুধু একটি কারখানার জেনারেটর বন্ধের গল্প নয়; এটি হাজার হাজার শ্রমিকের সম্ভাব্য বেকারত্বের আগাম বার্তা। চট্টগ্রাম ও অন্যান্য এলাকায় দেখা গেছে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চালকরা নিজেদের চাকরিই অনিশ্চিত ভেবে হতাশায় কাতর।
চতুর্থত, যাত্রী ও সাধারণ মানুষের কষ্টের আরেকটি বড় কারণ ছিল গণপরিবহন ও যাতায়াতের মারাত্মক ব্যাঘাত। মধ্যবিত্ত মানুষ অফিসে যাওয়া বা বাচ্চা স্কুলে নামানো ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। রাইড-শেয়ারিং অ্যাপ যেমন উবার এবং পাঠাও কার্যত অচল হয়ে পড়ে, কারণ ড্রাইভাররা তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় গাড়ি চালাতেই অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে। আবার যারা গাড়ি চালাতেন, তারা ভাড়া দ্বিগুণ ও তিনগুণ বাড়িয়ে দেন।
খবরে প্রকাশ, ‘চট্টগ্রামের কাপ্তাই রোডে ভাড়া বেড়ে গিয়েছিল ৩০-৪০ টাকা থেকে ৭০-১০০ টাকা পর্যন্ত’। এক অর্থে, মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই ‘জ্বালানি ও যাতায়াতের অনিশ্চয়তা’ নামক এক ভয়াবহ প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছিল। সাধারণ মানুষ অভিযোগ করে জানিয়েছেন যে, পাম্পের লাইন এড়িয়ে তারা ১২০ টাকার ডিজেল কালোবাজারে ২২০-২৫০ টাকায় কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
এমনকি ‘সেবা এক্সওয়াইজেড’ নামক অ্যাপ থেকে ‘রিফুয়েলিং ড্রাইভার সার্ভিস’ নামে নতুন ব্যবসার জন্ম হয়, যেখানে লাইনে দাঁড়ানোর জন্য একজন ভাড়া করা ড্রাইভার প্রতিঘণ্টা ২৪৫ টাকা নিচ্ছিল। শিল্প কারখানা বন্ধ, উদ্বেগ, ড্রাইভারদের ক্ষোভ সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এই অন্তহীন চক্রগুলো পরস্পরকে পুষ্ট করে যাচ্ছিল।
অবশেষে, পঞ্চম ধাপ হিসেবে, এই চরম দুর্দশা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তাই ‘অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ’ না হলেও অন্তত গণ-অস্থিরতা ও প্রকট প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। ‘অর্ধ-রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও’ তেল না পাওয়া চালক, পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপক হত্যার প্রতিবাদে ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া এবং সিলেটের মতো জেলায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে বিক্ষোভই প্রমাণ করে যে সম্পদের এই স্বল্পতা কত দ্রুত আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়ায় রূপ নিচ্ছে।
তেল নিয়ে সহিংসতায় প্রাণহানি, ধর্মঘট, এবং সরকারি তথ্যের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফুরিয়ে যাওয়া, এই সবকিছু মিলিয়ে ‘জন ও রাষ্ট্রের সংঘাতের ফাটল’ আরও প্রশস্ত হয়। এই সময় লোকজন একটি পর্যায়ে সরকারের ‘পর্যাপ্ত তেলের মজুদ আছে’ এর ঘোষণার কথাও বিশ্বাস করতে অস্বীকার করে, যার ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ও রাজপথে ‘সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার’ ছড়িয়ে পড়ে।
হোমার-ডিক্সনের তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য হলো, সম্পদের স্বল্পতা যখন সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতা ও জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন গণ-অস্বস্তি ও সশস্ত্র সংঘাতের সম্ভাবনা কয়েকগুণে বেড়ে যায়। বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটটিও তার ব্যতিক্রম নয়। তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহে ব্যাঘাত আর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কখনো কেবল ট্রাকে লাইনে দাঁড়ানোর যন্ত্রণা সৃষ্টি করেনি, বরং তা একটি দেশের অর্থনীতি, চাকরি, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক শান্তিকে বিনাশ করেছে।
এই সংকট নিষ্পত্তি করতে স্বল্পমেয়াদে শুধু আন্তর্জাতিক সমাধানের দিকে তাকিয়ে না থেকে জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্নীতি ও স্বল্পমেয়াদি অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের সংশোধন জরুরি। শুধু তখনই বাংলাদেশ হোমার-ডিক্সনের সতর্কবাণী অমান্য করে সম্পদের বণ্টনে সমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে এগোতে পারবে।
ড. মো. রফিকুল ইসলাম : অধ্যাপক, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)