বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে ২০২৬, ৩১শে বৈশাখ ১৪৩৩


হামের প্রকোপ : জনস্বাস্থ্যে উদ্বেগ ও আমাদের করণীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:১৪ মে ২০২৬, ১২:১৮

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে সংক্রামক ব্যাধি নির্মূলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্য সত্ত্বেও কিছু রোগ বারবার ফিরে এসে আমাদের জনস্বাস্থ্য কাঠামোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। হাম তেমনই একটি অত্যন্ত সংক্রামক ব্যাধি যা বর্তমানে বাংলাদেশে পুনরায় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি বাংলাদেশকে হামের ক্ষেত্রে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বারবার সতর্ক করে আসছিল যে, বিশ্বব্যাপী হামের প্রকোপ বাড়তে পারে।

ল্যানসেট ইনফেকশাস ডিজিজ জার্নালে প্রকাশিত তথ্যমতে, কোভিড-১৯ অতিমারির সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বিঘ্নিত হওয়া এবং জনগণের মধ্যে টিকা গ্রহণের প্রবণতা কমে যাওয়া এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান নিয়ামক। যদিও আমার ল্যাবরেটরিতে বর্তমানে হামের সেরোলজিক্যাল কনফার্মেশন বা আণবিক পরীক্ষা করার সংস্থান নেই, তবুও ক্লিনিক্যাল ডাটা, অন্য ল্যাবের রিপোর্ট এবং মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদনগুলো একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।

হাম একটি মরবিলিভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট রোগ। এটি মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে ভাইরাস বাতাসে প্রায় ২ ঘণ্টা ভেসে থাকে এবং আশপাশের অনাক্রম্য মানুষ সহজেই সংক্রমিত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর ‘R₀’ বা সংক্রমণ ক্ষমতা ১২–১৮; অর্থাৎ একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে আরও ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। বর্তমানে এত বেশি সংক্রমণ হওয়ার কারণ হলো, একজন আক্রান্ত শিশু তার চারপাশের অন্তত এক ডজন বা তার বেশি সুস্থ কিন্তু টিকা না নেওয়া শিশুকে আক্রান্ত করতে সক্ষম।

এ কারণেই হামকে পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি বলা হয়। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪ কোটি শিশু তাদের হামের ডোজ মিস করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’।

বাংলাদেশেও ইদানীং বিভিন্ন এলাকায় হামের ক্লাস্টার সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ২০২৫ থেকেই সতর্ক করেছিলেন যে, নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচির বাইরে থাকা শিশুদের সংখ্যা বাড়লে একটি বড় প্রাদুর্ভাব অবশ্যম্ভাবী। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকা এবং উপকূলীয় দুর্গম অঞ্চলগুলোয় এই ঝুঁকি বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলছে, যদি দেশের ৯৫ শতাংশ শিশুকে হামের দুই ডোজ টিকার আওতায় না আনা যায়, তবে আমরা একটি বৃহত্তর মহামারির মুখোমুখি হতে পারি। হাম কেবল একটি রোগ নয় বরং এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য পঙ্গু করে দেয়, যাকে বলা হয় ‘ইমিউন অ্যামনেশিয়া’।

শিশুরা কেন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে তার পেছনে গভীর মাইক্রোবায়োলজিক্যাল কারণ রয়েছে। জন্মের পর শিশু মায়ের শরীর থেকে অর্জিত নিষ্ক্রিয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। কিন্তু ৬ থেকে ৯ মাস বয়সের পর এই সুরক্ষার মাত্রা কমতে শুরু করে। ঠিক এই সময়েই প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া জরুরি।

জার্নাল অফ ইনফেকশাস ডিজিজেস-এর একটি গবেষণা বলছে, অপুষ্টির শিকার শিশুরা, বিশেষ করে যাদের শরীরে ভিটামিন-এ এর ঘাটতি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে হামের ভাইরাস অতি দ্রুত শ্বসনতন্ত্রের এপিথেলিয়াল কোষকে আক্রমণ করে।

শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরিণত না হওয়ায় তারা ভাইরাসের প্রোটিনগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। ফলে জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি অন্ধত্বের ঝুঁকি তাদের ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি।

আগেই বলেছি, হামের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি লিম্ফোসাইট বা রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলো আক্রমণ করে। আসলে আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কিছু বিশেষ কোষ থাকে যাদের বলা হয় ‘মেমোরি সেল’। আমরা যখন অতীতে কোনো রোগে আক্রান্ত হই বা ভ্যাকসিন নেই, এই কোষগুলো সেই জীবাণুর তথ্য মনে রাখে। ভবিষ্যতে একই জীবাণু আক্রমণ করলে তারা দ্রুত তাকে চিনে ফেলে এবং ধ্বংস করে।

হামের ভাইরাস সরাসরি এই মেমোরি সেলগুলো আক্রমণ করে এবং ধ্বংস করে দেয়। ফলে শরীর তার অতীতে অর্জিত সব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘স্মৃতি’ হারিয়ে ফেলে। হামের সংক্রমণের সরাসরি প্রভাবে যত মানুষ মারা যায় বা যাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ মারা যেতে পারে হাম-পরবর্তী এই ইমিউন অ্যামনেশিয়ার কারণে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে।

এটি শরীরকে একটি ‘খালি স্লেট’ বা নবজাতক শিশুর মতো অরক্ষিত অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বর্তমানে এটাই হচ্ছে এতো বাচ্চা মারা যাওয়ার কারণ। হামের টিকা নিলে এই ইমিউন অ্যামনেশিয়া ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব। এটি কেবল হাম থেকেই রক্ষা করে না, বরং শরীরের অর্জিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও সুরক্ষিত রাখে। পাশাপাশি রোগ পরবর্তী সময়ে শরীরকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে ভিটামিন-এ এবং সুষম খাবার অত্যন্ত জরুরি।

হাম সংক্রমণের হলে যে ‘ইমিউন অ্যামনেশিয়া’ তৈরি হয়, তা শিশুকে পরবর্তী ২-৩ বছর অন্য যেকোনো সংক্রমণের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তোলে। হামের এই বর্তমান প্রাদুর্ভাব সংকেত দিচ্ছে যে, আমাদের টিকাদান কর্মসূচির ফাঁক দিয়ে রুবেলা, ডিপথেরিয়া এমনকি পার্টুসিস (হুপিং কাশি)-এর মতো রোগগুলোও পুনরায় ফিরে আসতে পারে। যেহেতু হাম-রুবেলা টিকা একসাথে দেওয়া হয় তাই হামের পাশাপাশি রুবেলার সংক্রমণ বাড়লে জন্মগত ত্রুটি বা কনজেনাইটাল রুবেলা সিনড্রোম সম্পন্ন শিশুর জন্মহার বাড়তে পারে।

একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে উপলব্ধি করছি যে, আমাদের রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার বিকেন্দ্রেীকরণ জরুরি। বর্তমানে অনেক মেডিকেল কলেজ ল্যাবরেটরিতে হামের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক কিট বা এলিজা টেস্টের সুবিধা নেই। ফলে আমাদের ক্লিনিক্যাল সিম্পটম অর্থাৎ উচ্চ জ্বর, কাশি, সর্দি এবং মুখগহ্বরে ‘কপলিক স্পট’ দেখে রোগ শনাক্ত করতে হচ্ছে।

তবে সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জন্য ল্যাবরেটরি কনফার্মেশন প্রয়োজন যাতে আমরা ভাইরাসের মিউটেশন বা জেনোটাইপ ট্র্যাক করতে পারি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় আমাদের ত্রি-মুখী কৌশল অবলম্বন করতে হবে।

১. র‍্যাপিড ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন: যেসব শিশু টিকা মিস করেছে তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা।

২. ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর গাইডলাইন অনুযায়ী আক্রান্ত শিশুকে উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ প্রদান করা মৃত্যুঝুঁকি অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেয়।

৩.জনসচেতনতা: শরীরে দানা বা র‍্যাশ ওঠার অন্তত ৪ দিন আগে ও ৪ দিন পরে শিশু সব থেকে বেশি ভাইরাস ছড়ায়। এই সময় শিশুকে আইসোলেশনে রাখা এবং মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

তথ্যসূত্র:

১. WHO Measles and Rubella Strategic Framework (2021-2030)।

২. The Lancet: ‘The looming threat of measles resurgence post-COVID-19’।

৩. Journal of Infectious Diseases: ‘Molecular insights into Measles-induced Immune Amnesia’।

৪. Bangladesh EPI Surveillance Report 2023-24।

ডা. কাকলী হালদার : সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়