সোমবার, ২৫শে মে ২০২৬, ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ফাইল ছবি
বাংলা গানের বিকাশ ও বিবর্তনে নজরুল সংগীত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানে উল্লেখ্য যে পঞ্চকবির মধ্যে একমাত্র নজরুলই এত ব্যাপক ও বিস্তৃত বিষয়ভিত্তিক ও বিভিন্ন সুরের আঙ্গিক নিয়ে কাজ করেছেন। এত বিচিত্র ধারার সুর ও রাগের আঙ্গিকের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আবার নতুন নতুন রাগ সৃষ্টি ও সুর-বাণীর সম্মিলনে গান রচনা কেবল নজরুলের দ্বারাই সম্ভব হয়েছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নজরুলের প্রতিটি আঙ্গিকের বা পর্যায়ের গানের বিষয়বস্তুতে তো বটেই সুর-বৈচিত্র্যেও এক একটি গানে অপরটির চেয়ে ভিন্ন ও স্বকীয় ধারার সুরের সমাবেশ ঘটেছে। এই যে বিভিন্ন ধারার গান তিনি রচনা করে গেছেন তার প্রতিটির সুর অভিন্ন ও সুর বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ।
নজরুলের রোমান্টিক বা আধুনিক ধারার গানগুলো প্রেম ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশের এক চিরায়ত ও শাশ্বত নাম, যা যুগে যুগে সমান জনপ্রিয়তার সাথে সমাদৃত হয়ে আসছে।
কবি ভালোবাসার জন্য স্বর্গ সুখ ও বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। ভালোবাসার তীব্র অমৃত সুধা কবি মনকে উদ্বেলিত ও উৎসাহিত করেছে। তাই বলা হয়ে থাকে নজরুলের গান চির আধুনিক সমসাময়িক ও ব্যতিক্রমী। কারণ তিনি একই সঙ্গে মানব প্রেম ও প্রকৃতির সম্মিলনে রচনা করেছেন তার অবিস্মরণীয় গানের মালা।
কবি প্রকৃতির মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন ভালোবাসার সব নিয়ামক। কখনো বলেছেন, ‘সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি আমারে ছুঁইয়াছিলে’, ‘গানগুলি মোর আহত পাখির সমলুটাইয়া পড়ে তব পায়ে প্রিয়তম।‘, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেব খোঁপায় তারার ফুল’।
কবি কখনো প্রিয়াকে সাজাতে চেয়েছেন কল্পনার তারার ফুল, চৈতি চাঁদের দুল, জোছনা সাথে চন্দন, গানের সাত সুরের কণ্ঠহার দিয়ে। ‘আধখানা চাঁদ হাসিছে আকাশে আধখানা চাঁদ নিচে’, অর্থাৎ কবি আকাশের চাঁদের সাথে ধরণীতে প্রিয়ার মুখের উপমা তুলে ধরেছেন। আবার গগনের তারার সাথে প্রিয়ার চোখের তারার মিল খুঁজে ফিরেছেন।
‘তোমারেই আমি চাহিয়াছি প্রিয় শতরূপে শতবার।
জনমে জনমে চলে তাই মোর অনন্ত অভিসার।
বনে তুমি যবে ছিলে বনফুল
গেয়েছিনু গান আমি বুল্বুল্',
গানটিতে কবি বাংলা গানের বুলবুল হয়ে গান গেয়েছেন তার প্রিয়া, বনফুলের জন্য। কখনো আবার কবি প্রকৃত মুসলিমদের হৃদয় নিয়ে হতে চেয়েছেন আরবের পথ মরুর ধূলি, মরুর হাওয়া লিখেছেন, ‘আমি যদি আরব হ’তাম — মদিনারই পথ।’, ‘আয় মরু পারের হাওয়া নিয়ে যা রে মদিনায় —’, ‘মরুর ধুলি উঠলো রেঙে রঙিন গোলাপ রাগে’।
মুসলিম বিশ্বের সম্প্রীতি ও নবজাগরণের জন্য তিনি রচনা করেছেন সাম্য মৈত্রী ও মানবতার গান, ‘ধর্মের পথে শহীদ যাহারা আমরা সেই সে জাতি সাম্য-মৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্বে করেছি জ্ঞাতি’, ‘মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’, ‘চীন আরব হিন্দুস্থান নিখিল ধরাধাম জানে আমায় চেনে আমায় মুসলিম আমার নাম’, ‘অনাদি কাল হতে অনন্তলোক গাহে তোমারি জয়’, ‘অনাদি কাল হতে অনন্তলোক গাহে তোমারি জয় আকাশ–বাতাস রবি–গ্রহ তারা চাঁদ, হে প্রেমময়।’
কাজী নজরুল ইসলামই একমাত্র কবি যিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনার ঝান্ডা উড়িয়েছিলেন। কবি একইসঙ্গে অজস্র ইসলামী গানের পাশাপাশি সমান দক্ষতায় ভজন কীর্তন ও শ্যামা সংগীত রচনা করে গেছেন যা আজও সব বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু ধর্মীয় মানবজাতির কাছে সমান জনপ্রিয় ও সমাদৃত।
কবি লিখেছেন, ‘(মা) আয় মা উমা! রাখ্ব এবার ছেলের সাজে সাজিয়ে তোরে।/(ওমা) মা’র কাছে তুই রইবি নিতুই, যাবি না আর শ্বশুর ঘরে।’, ‘কী দশা হয়েছে মোদের দেখ্ মা উমা আনন্দিনী’, ‘শ্যামা নামের লাগলো আগুন আমার দেহ ধূপ–কাঠিতে’, ‘তুমি আনন্দ ঘনশ্যাম আমি প্রেম-পাগলিনী রাধা’, ‘যত নাহি পাই দেবতা তোমায়, তত কাঁদি আর পূঁজি’, ‘এলো কৃষ্ণ কানাইয়া তমাল বনে সাজো ঝুলনের সাজে’, ‘শুকসারী সম তনু মন মম নিশিদিন গাহে তব নাম’, ‘মাগো চিন্ময়ী রূপ ধ’রে আয় মৃন্ময়ী রূপ তোর পূজি শ্রী দুর্গা তাই দুর্গতি কাটিল না হায়।’
যুগে যুগে নারী জাগরণে আমরা গেয়ে চলেছি কবির অমোঘ বাণী, ‘জাগো নারী জাগো বহ্নি-শিখা।' দুঃশাসন, শোষণ ও নিপীড়নের প্রতিবাদে এখনো সোচ্চার কণ্ঠে আপামর বাঙালি বাঙালি জাতি গেয়ে ওঠে, ‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার হে!লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার।’, ‘এই শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল।’, ‘আজি রক্ত নিশি-ভোরে একি এ শুনি ওরে মুক্তি-কোলাহল বন্দী-শৃঙ্খলে’,
শান্তি সমৃদ্ধি ও সাম্যবাদের অমোঘ বাণী কবি কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে, ‘জয় হোক জয় হোক — শান্তির জয় হোক, সাম্যের জয় হোক্,’। আবহমানকালের সংগীত ধারায় নজরুলের গান সংগীত পিপাসু ও সংগীত বোদ্ধাদের হৃদয়ের আনন্দ-বেদনা, উচ্ছ্বাস উল্লাস, ভক্তি, প্রেম, দ্রোহ, জাগরণ প্রতিবাদ পরিক্রমায় সবদিক দিয়ে গোটা বিশ্ববাসীর অন্তর লোককে স্পর্শ করেছে।
কালের আবর্তে আপামর বাঙালি জাতির রুচি পছন্দ ও সংগীত রীতি এবং যন্ত্রানুষঙ্গে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। মানুষ এখন ধৈর্য ধরে গ্রামোফোন রেকর্ডের গান শুনে তৃপ্তি বা স্বস্তি পান না। দুর্বল শব্দ ধারণ, সংক্ষিপ্ত সংগীত আয়োজন, ত্রুটিযুক্ত শ্রবণ নমুনা এর মূল কারণ।
অথচ এই গানগুলোই রেকর্ড থেকে সুর পুনরুদ্ধার করে সুরের কোনোরকম বিচ্যুতি না ঘটিয়ে গানের কাঠামো বজায় রেখে আধুনিক কিন্তু উপযুক্ত যন্ত্রানুষঙ্গ সহযোগে পরিবেশিত হলে নজরুলের গানের সুর-বাণী ও ভাবদর্শন বজায় থাকে এবং এই ধরনের গায়নের প্রচলন শুরু হয়েছে অনেকদিন ধরেই।
নজরুলের গানের সঠিক ও প্রমিত সুর উদ্ধার এবং পুনরুদ্ধারকৃত সুরের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে শুদ্ধচর্চার পথ ও প্রক্রিয়াটি এখন অনেক দূর সম্প্রসারিত ও পরিণত রূপ নিয়েছে। যদিও একদল নবীন শিল্পী গোষ্ঠী অত্যাধুনিক যন্ত্রানুষঙ্গের সাথে নজরুলের গানের বিকৃত ও ফিউশন ফর্মের প্রয়োগ ও সম্প্রচারে ব্যতিব্যস্ত, যা ডিজিটাল দুনিয়ায় খুব দ্রুত ছড়িয়েও পড়ছে।
প্রশ্ন চলে আসে, নজরুলের গান কি তবে সুর বাণী বিষয়-বস্তুতে সম্পূর্ণ নয়? কেন এই অপচেষ্টা, কেন অতিরিক্ত যন্ত্রানুসঙ্গ প্রয়োগ করে নজরুলের গান উপস্থাপন করতে হবে? যা সুর ও বাণীকে ছাপিয়ে যাচ্ছে এবং যন্ত্রানুষঙ্গই সেসব গানে প্রাধান্য পাচ্ছে!
বলা প্রয়োজন যে, নজরুলের গান যথার্থ বিষয় নির্ভর, ভাব নির্ভর এবং রাগ রাগিণী সমৃদ্ধ, বাণী, সুর, তাল সংমিশ্রণে পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। আর তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে শুধু বিচিত্র পর্যায় বা অঙ্গেরই নয়, তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ গায়কি ও নজরুলের গানকে করেছে আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয়।
নজরুল প্রদত্ত গায়কির সীমিত স্বাধীনতা এক সময়ে নজরুলের গানকে বিকৃতি ও বিশৃঙ্খলার চরম শিখরে নিয়ে গিয়েছিল। একই গানে একাধিক ও বেমানান সুর সংগীত আয়োজন করে নজরুলের গানকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদিও তা সফলতা পায়নি। কাজী নজরুল ইসলাম তার জীবদ্দশায় তা নিয়ে আক্ষেপ করে গেছেন।
নজরুলের গানের বাণী ও সুর সর্বকালের জন্য সর্বজনবিদিত। নজরুল চির আধুনিক চির নবীন। তার বাণী ও সুর জাতি-ধর্ম-বর্ণ বিচারে অত্যন্ত সময়োপযোগী, বাস্তবধর্মী ও আধুনিক। নজরুল সংগীত বাংলা নাগরিক গানের ইতিহাসে এক স্বয়ং সম্পূর্ণ ঐশ্বর্যময় সংগীত ভান্ডার যা আজও পুনরুদ্ধার ও শুদ্ধ তথা প্রমিত আদি সুর সংগ্রহের প্রক্রিয়ার মধ্যে চলমান রয়েছে।
ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকের গানগুলো দক্ষ ও চর্চিত শিল্পীর গায়কিতে আরও প্রাঞ্জল ও প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। প্রতিটি আঙ্গিকের নজরুলের গানের গায়কিতে ভিন্নতা রয়েছে তাই যতই আধুনিক সুরযন্ত্র ব্যবহার করা হোক না কেন বা অতিরিক্ত সুর প্রয়োগ ও যন্ত্রানুসঙ্গ যোগ করা হোক না কেন নজরুল নির্দেশিত সুরের পথে হেঁটে ওই বিশেষ গায়কিতে গানটি পরিবেশিত হলে নজরুল সংগীতের যথার্থ মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে।
বিশ্বময় নজরুলের গানগুলোর সঠিক ও প্রমিত সুর বজায় রেখে দক্ষ ও পরিমিত গায়কিতে উপযুক্ত যন্ত্রানুষঙ্গ ব্যবহার করা সম্ভব এবং এভাবে নজরুলের গানের প্রচার প্রসারে এগিয়ে আসা আপামর বাঙালি জাতির পবিত্র কর্তব্য।
নজরুল সংগীতের সুরের বিকৃতি রোধে শুদ্ধতা ও মৌলিকত্ব বজায় রেখে এভাবে সম্মিলিতভাবে কাজ করে গেলে, কাজী নজরুল ইসলাম ‘চিরদিনের নজরুল’ হয়ে আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত থাকবেন।
নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি : শিল্পী ও প্রশিক্ষক, ছায়ানট