বৃহস্পতিবার, ১১ই জুন ২০২৬, ২৮শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
১১ জুন ২০২৬ উপস্থাপিত হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ার কারণে এ বাজেটকে ঘিরে জনমনে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের প্রেক্ষিতেও এবারের বাজেটের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
তবে অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা যথেষ্টই জটিল-একদিকে যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি অপরদিকে রয়েছে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা। এর পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের নিম্ন হার বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে এবারের বাজেট অন্যান্য বছরের চাইতে বেশ চ্যালেঞ্জিং বলেই মনে হচ্ছে।
বাজেটের আয়-ব্যয়ের সমীকরণে সরাসরি সংযুক্ত না থাকলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বাজেট প্রণয়নে বিবেচিত হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন বাণিজ্য সহযোগী দেশের অর্থনীতির মন্দাভাব, ইউক্রেন যুদ্ধ, সর্বোপরি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এসব বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান মূল্যস্ফীতির পেছনে কাজ করছে।
মুদ্রানীতি ও সংকোচনমূলক রাজস্বনীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও, মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান বলে যে, ২০২৬ সালের শুরুর দিক থেকেই দ্রব্যমূল্যের পারদ ঊর্ধ্বগামী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে যা ষোল মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গ্রাম ও শহর উভয় জায়গাতেই নয় শতাংশের ওপর মূল্যস্ফীতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এর পাশাপাশি খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৬ শতাংশ এবং খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৭ শতাংশ।
এ পরিস্থিতিতে আসন্ন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নাগালে রাখতে হলে পরোক্ষ করের (যেমন ভ্যাট) পরিবর্তে প্রত্যক্ষ করের (যেমন ব্যক্তিখাতে আয়কর) মাধ্যমে রাজস্ব আহরণে জোর দিতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের ওপর ভ্যাটের হার কমানো, টিসিবির আওতা বিশেষভাবে বাড়ানো ইত্যাদি বিষয়গুলো মূল্যস্ফীতি থেকে সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
তবে রাজস্ব আহরণের বর্তমান বাস্তবতায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাত থেকে অধিক হারে ঋণ নেওয়া হলে তা একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে, অপরদিকে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
এর পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে সতর্ক থাকতে হবে যেন তা মূল্যস্ফীতির বাড়তি ওপর চাপ তৈরি না করে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেট কেন্দ্রিক রাজস্বনীতির পাশাপাশি সুচিন্তিত মুদ্রানীতি, বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি ও দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
মূল্যস্ফীতিকে অগ্রাধিকারে নেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ মন্দার বিপরীতে গতি সৃষ্টি করার বিষয়টি বাজেটে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা দরকার বলে মনে করছি। বেসরকারি বিনিয়োগ কয়েক বছরে নিম্নগামী প্রবণতা দেখাচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ও জিডিপির অনুপাত ছিল মাত্র ২২.৫ শতাংশ, যা দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এর পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহও নিম্নগামী প্রবণতা দেখাচ্ছে, এপ্রিল ২০২৬-এ বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও উচ্চ সুদের হার, আর্থিক খাতের দুর্বল অবস্থা, জ্বালানির উচ্চমূল্য, ব্যবসার উচ্চ খরচ, এসব বিষয়ের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে যে শ্লথগতি তা শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাজেটে শ্রমঘন খাতের সংশ্লিষ্ট শিল্পে প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থানকে উজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এবারের বাজেটে সৃজনশীল খাতে গুরুত্ব আরোপ করার কথা বলা হচ্ছে—এধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বিনিয়োগে গতি সঞ্চারণ তাই এ বাজেটের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এপ্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ কলকারখানা চালুর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
এর সাথে সাথে ব্যবসায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে এ বাজেটে কিছু উদ্যোগ থাকবে বলে শোনা যাচ্ছে। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগে ব্যাংক ঋণের বিষয়ে প্রচুর আলোচনা হলেও, মনে রাখা প্রয়োজন যে, দেশি-বিদেশি উভয় প্রকার বিনিয়োগের জন্যই সবচেয়ে জরুরি ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা (ইজ অব ডুয়িং বিজনেস) ও ব্যবসার খরচ কমানো (কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস)। সে প্রেক্ষিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর পাশাপাশি ভ্যাট, আয়কর, ও বিভিন্ন শুল্কের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে হবে।
বৃহৎ শিল্পে গতি আনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রণোদনা ও বরাদ্দের প্রয়োজন রয়েছে। সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানো, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা ও অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য কর ছাড় ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দুর করার জন্য এ বাজেটে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
মূলত বৃহৎ শিল্পের স্থবিরতার প্রেক্ষিতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে ঘিরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে চাঙা করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, যার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করা সম্ভব।
বিনিয়োগের সাথে সম্পর্কযুক্ত হলেও কর্মসংস্থান তৈরি এ বাজেটের আরেকটি অগ্রাধিকারের জায়গা হিসেবে আলাদাভাবে বিবেচিত হওয়া দরকার। ব্যবসা বাণিজ্যের শ্লথ গতি, শ্রমঘন শিল্পে সেভাবে বিনিয়োগ না হওয়া, অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতার অভাব, অটোমেশনের প্রভাব ইত্যাদি বিষয়গুলোর কারণে বেকারত্ব কমানো ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
তবে তরুণ উদ্যোক্তাদের কাজের সুযোগ তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের জন্য বাজেটে নীতিগত প্রণোদনার প্রয়োজন আছে। তরুণদের জন্য ফ্রি-ল্যান্সিং, স্টার্ট আপ ও অনলাইন ভিত্তিক কাজের সুযোগের বিষয়ে প্রণোদনা ও সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের বিষয়টি অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষিত বেকারত্বের বিষয়টি একটি উদ্বেগের জায়গা-উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার ১৩.৫৪ শতাংশ যেখানে সার্বিকভাবে বেকারত্বের হার ৩.৪৪ শতাংশ। এ অবস্থা থেকে উন্নীত হতে হলে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে বাজেটে বিশেষ প্রকল্প ও বরাদ্দ থাকতে পারে এবং এর সাথে সাথে কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন।
মনে রাখা জরুরি, সামাজিক অবকাঠামো, যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানো ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব না। বিশেষ করে তরুণ জনশক্তির শিক্ষা ও দক্ষতায় মনোযোগ না দেওয়া হলে জনমিতির সুবিধা আমরা হারাবো। এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা শোনা যাচ্ছে—যা শিক্ষাখাতের গুণগত পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে। তবে এ প্রেক্ষিতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিবর্তে গুণগত মান বৃদ্ধিতে প্রকল্প প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এ বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যেটি এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে ও তৃণমূলের মানুষের দারিদ্র ঝুঁকি কমাতে ও আয় বৈষম্য কমাতে ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। এ প্রেক্ষিতে ভাতার পরিমাণ বাড়ানো ও উপকারভোগীদের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ডের মতো নতুন কর্মসূচি সংযুক্ত করা হয়েছে।
তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে ও দ্বৈততা দূর করতে, সোশ্যাল রেজিস্ট্রির মতো তথ্য ভাণ্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মসূচিগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে এবং প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে শহরাঞ্চলের দরিদ্রদের বিভিন্ন কর্মসূচির আওতাভুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
তবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকাটা বর্তমান রাজস্ব আহরণের বাস্তবতায় বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। কারণ আকাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব আহরণ করা না গেলে, ব্যয় মেটাতে যদি ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়া হয়, তাহলে তা মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে সার্বিকভাবে বলতে গেলে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজেট প্রণয়নের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং দিক হচ্ছে রাজস্ব আহরণে আশঙ্কাজনক শ্লথ গতি। কর-জিডিপির ৬.৭ শতাংশ হার নিয়ে ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।
প্রত্যক্ষ করের ক্ষেত্রে ট্যাক্স-স্ল্যাব যথাযথ পরিমার্জনা এনে করজালকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা ব্যতীত বাজেট প্রণয়ন করা হলে তা ঘাটতির চাপ আরও বাড়াবে। কর আহরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটালাইজেশনের যেমন কোনো বিকল্প নেই, উত্তরাধিকার কর, সম্পদ কর কিংবা সারচার্জের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়ও গুরুত্বের সাথে এবারের বাজেটে আনা প্রয়োজন।
রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচলন ব্যয়ে কৃচ্ছ্রতা সাধনে জোর দিতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের সুফল পেতে হলে অর্থবছরে নিয়মিতভাবে মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যেতে পারে যে, রাজস্ব আহরণ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের এই কঠিন সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও একইসাথে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগে গতি আনার জটিল হিসেব মিলবে কিনা তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে এই বাজেটে কী ধরনের দিকনির্দেশনা থাকবে তার ওপর।
ড. সায়মা হক বিদিশা : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়