শনিবার, ৪ঠা জুলাই ২০২৬, ২০শে আষাঢ় ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
প্রতি বছর ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে পালিত হয় স্বাধীনতা দিবস। ১৭৭৬ সালের এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণের মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তা কেবল একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মই দেয়নি; বরং আধুনিক গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সাংবিধানিক শাসন এবং মানবাধিকারের এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। আড়াই শতকের এই যাত্রা বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়, যেখানে স্বাধীনতার আদর্শ, অর্থনৈতিক উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব এবং বৈশ্বিক কূটনীতির সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্র আজও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শক্তি।
দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বরাজনীতিতে শুধু একটি পরাশক্তি নয়, বরং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠন, মুক্তবাণিজ্য, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন ভিত্তি তৈরি করে। মার্শাল পরিকল্পনার মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ পুনর্গঠনে তার ভূমিকা আন্তর্জাতিক সংহতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উচ্চারিত ‘সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্ট’ এই নীতিই যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদর্শনের মূল ভিত্তি। যদিও এই আদর্শ বাস্তবায়নের পথে দেশটিকে দাসপ্রথা, বর্ণবৈষম্য, নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তবুও আত্মসমালোচনা ও সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এই আত্মসংশোধনের ক্ষমতাই দেশটির অন্যতম শক্তি।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির একটি হিসেবে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা, জৈবপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব মানবসভ্যতার অগ্রগতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং উদ্ভাবনী পরিবেশ আন্তর্জাতিক মেধাকে আকৃষ্ট করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, বরং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক ভূমিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সংকট মোকাবিলায় নেতৃত্ব। ন্যাটো জোটের মাধ্যমে ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানবিক সহায়তা প্রদান এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভ্যাকসিন গবেষণা, চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক সহযোগিতায়ও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশের জন্যও যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও কৌশলগত অংশীদার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বৃহৎ বাজার যুক্তরাষ্ট্র। শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেও দুই দেশের সহযোগিতা ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছে। একই সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করছে।
তবে স্বাধীনতার ২৫০ বছরে পৌঁছে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতুন বাস্তবতা ও জটিল চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বহুমেরুকরণ দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, ভারতের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ভূমিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রচেষ্টা এবং মধ্যম শক্তিগুলোর সক্রিয় কূটনীতি আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন একক আধিপত্যের পরিবর্তে অংশীদারিত্বভিত্তিক নেতৃত্বের দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা আগামী দশকের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো এই ক্ষেত্রগুলোর অন্যতম প্রধান উদ্ভাবক হলেও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখতে গবেষণা, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় আরও বিনিয়োগ অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, দাবানল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়া শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু নেতৃত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, সবুজ প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে দেশটির নেতৃত্ব বিশ্বব্যাপী ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। মুক্ত ও নিরাপদ সমুদ্রপথ, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা আগামী দিনের বৈশ্বিক সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য, সামাজিক সংহতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুসংহত করা জরুরি। একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের ভিত্তি কেবল নির্বাচন নয়; বরং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। এই মূল্যবোধগুলো যত শক্তিশালী হবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব তত বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।
স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি তাই কেবল একটি জাতীয় উৎসব নয়; এটি আত্মসমালোচনা, অর্জনের মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ইতিহাস দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় নয়; বরং উদ্ভাবন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বহুত্ববাদ এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতায় নিহিত।
আজকের বিশ্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আন্তঃনির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, সাইবার হুমকি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার এসব চ্যালেঞ্জ কোনো একক রাষ্ট্র একা মোকাবিলা করতে পারে না।
তাই আগামী দিনের বিশ্ব নেতৃত্ব হবে সহযোগিতা, আস্থা ও অংশীদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে। যুক্তরাষ্ট্র যদি স্বাধীনতার মূল আদর্শ স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধরে রেখে বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, তবে আগামী শতাব্দীতেও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তার নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
আড়াই শতাব্দীর এই ঐতিহাসিক যাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করেছে যে স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়; এটি একটি চলমান প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি, মানবকল্যাণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্যও দেশটি একই আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করবে। স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে এটাই হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় বার্তা এবং বিশ্বের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশা।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস কেবল একটি রাষ্ট্রের জন্মদিনের উদযাপন নয়; এটি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি একটি ঐতিহাসিক অঙ্গীকারের প্রতীক। তবে আজকের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে এই আদর্শগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র কতটা ধারাবাহিকভাবে নিজস্ব নীতি ও আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডে সেগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে পারে তার ওপর।
শক্তির পাশাপাশি বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বই হবে ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি। তাই ৪ জুলাই শুধু অতীতের গৌরব স্মরণের দিন নয়, বরং গণতন্ত্র, শান্তি, সহযোগিতা ও ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় নতুন করে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আজ আর শুধু উন্নয়ন সহযোগিতা বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ক্রমেই একটি বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারত্বে পরিণত হচ্ছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ দমন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মতো নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অন্যদিকে, বাংলাদেশ তার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ককে আরও গভীর করতে আগ্রহী। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, টেকসই উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ঢাকা–ওয়াশিংটন সহযোগিতা আগামী দিনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ড. সুজিত কুমার দত্ত : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-বাংলাদেশ সেন্টার