শনিবার, ৯ই মে ২০২৬, ২৬শে বৈশাখ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও হাজার হাজার স্কুলে সাইবার হামলা হয়েছে। এর ফলে বছরের শেষের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সময়ে এসে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি এবং বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে।
শাইনি হান্টার নামে একটি হ্যাকিং গ্রুপ এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। মূলত, তাদের এই হামলার ফলে হাজার হাজার স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহৃত একাডেমিক সফটওয়্যার ক্যানভাস এই সপ্তাহে অচল হয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার ক্যানভাস-এর মালিক প্রতিষ্ঠান ইন্সট্রাকচার তাদের ওয়েবসাইটে জানায়, এই সাইবার হামলা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল, যার প্রভাবে আনুমানিক নয় হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে অধিকাংশ ব্যবহারকারীর জন্য ক্যানভাস আবার চালু হয়েছে। যদিও শুক্রবারও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সেবা বিঘ্নের অভিযোগ জানিয়েছে।
মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের হারিয়ে যাওয়া কাজ পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিতে শুক্রবারের ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত করার কথা জানিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী অবরে পালমার জানান, তার স্ক্রিনে যখন মুক্তিপণের বার্তা ভেসে তখন তিনি মাত্রই ২ হাজার ৯০০ শব্দের একটি পরীক্ষার প্রবন্ধ শেষ করেছিলেন। বার্তাটিতে লেখা ছিল: ‘শাইনি হান্টারস আবারও ইন্সট্রাকচারের নিরাপত্তা ভেঙে ঢুকেছে’।
বার্তায় হুমকি দেওয়া হয়েছে, ক্যানভাস বা ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিটকয়েনে মুক্তিপণ না দিলে চুরি করা তথ্য প্রকাশ করে দেওয়া হবে।
পালমার বলেন, ‘আমি প্রথমে ভেবেছিলাম যে আমাকেই হ্যাক করা হয়েছে, কারণ ব্যাপারটা ঠিক সেরকমই দেখাচ্ছিল। কিন্তু পরে মুক্তিপণের নোটটি পড়ে বুঝলাম ক্যানভাসই হ্যাক হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, তিনি তখন তার অধ্যাপক এবং আরও কয়েক ডজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে ছিলেন। সবাই চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন যে একই বার্তা তারা সবাই পেয়েছেন। প্রথমদিকে, তাদের কাজ সেভ হয়েছে কি না তা স্পষ্ট ছিল না। এ সময় খুব দ্রুতই শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে এবং আবার পরীক্ষার লেখা লিখতে হতে পারে- এই চিন্তায় খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন।
এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি ইমেইলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আপডেট দিচ্ছে, পরীক্ষার নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করছে এবং এ ধরনের দেশব্যাপী নিরাপত্তা ঘটনার জেরে সন্দেহজনক বার্তা উপেক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনি শুক্রবার তাদের শিক্ষার্থীদের জানায়, ক্যানভাস ব্যবহার করা যাচ্ছে না এবং তারা শিক্ষার্থীদের লগইন করার চেষ্টা না করতে নির্দেশ দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের ওয়েবসাইটে লিখেছে, ‘বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমরাও এই বিভ্রাটের শিকার এবং আমরা এখনও ইন্সট্রাকচারের পরামর্শের অপেক্ষায় আছি’।
বৃহস্পতিবার ইদাহো স্টেট ইউনিভার্সিটি জানায়, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার পর নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো বাতিল করা হয়েছে।
পেন স্টেট ইউনিভার্সিটি বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের পাঠানো এক বার্তায় জানায় যে ‘কেউই ক্যানভাস-এ প্রবেশ করতে পারছে না' এবং পরবর্তী '২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান আসার সম্ভাবনা কম'। বিশ্ববিদ্যালয়টি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের কিছু পরীক্ষা বাতিল করে।
ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া শিক্ষার্থীদের জানায়, ক্যানভাস এর এর মূল কোম্পানি ইন্সট্রাকচারের সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের কারণে অচল এবং তাদের দ্রুত লগ আউট করার পরামর্শ দেয়।
এছাড়াও কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলস, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো, নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিও আরও বহু বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যলয় একই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।
উল্লেখ্য, শাইনি হান্টারস অতীতেও একাধিক আলোচিত সাইবার হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল। এর মধ্যে গত বছর জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার এর ওপর চালানো বড় এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হ্যাকটি ছিল অন্যতম।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এমিসফট- এর বিশ্লেষক লুক কনলি সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানান, স্ক্রিনশট অনুযায়ী এই গোষ্ঠীর লক্ষ্যভিত্তিক হুমকি রোবার থেকে শুরু হয় এবং বৃহস্পতিবার ও ১২ মে পর্যন্ত সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, মুক্তিপণ নিয়ে আলোচনা এখনও চলতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক হামলায় তারা যে তথ্য চুরি করেছে বলে দাবি করছে, তা নিয়ে ভবিষ্যতে কী করবে—সে বিষয়ে এখনো কিছু জানায়নি শাইনি হান্টারস।
বৃহস্পতিবারের এই সাইবার হামলাগুলো এমন এক সময়ে ঘটে, যেদিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার দ্রুত বিকাশমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সাইবার ঝুঁকির বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষার আহবান জানিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে একটি চিঠি পাঠান।
তিনি লিখেছেন, ‘হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে অবিলম্বে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করতে হবে। আমেরিকানরা এমন বিভ্রাট, বিঘ্ন এবং মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে- এমন হামলার শিকার হওয়ার আগেই পদক্ষেপ নিতে হবে।’
সূত্র: বিবিসি