বুধবার, ১৩ই মে ২০২৬, ৩০শে বৈশাখ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
মদিনা মুনাওয়ারা এক স্বর্গীয় প্রশান্তির নগরী। এই নগরীর প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর স্মৃতি ও ভালোবাসা। পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ে মদিনার নাম উচ্চারিত হলেই এক অন্যরকম আবেগ জাগ্রত হয়। আর সেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হলো মসজিদে নববি- যেখানে সবুজ গম্বুজের নিচে শায়িত আছেন দো-জাহানের মহান নেতা রাসুলুল্লাহ (স.)।
মসজিদে নববির মর্যাদা ও পবিত্রতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এর ভেতরে অবস্থিত ‘রিয়াজুল জান্নাত’ বা জান্নাতের বাগান। এটি মুমিন হৃদয়ের জন্য দুনিয়াতেই জান্নাতের অনুভূতি। এখানে দাঁড়ালে হৃদয় এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে ওঠে, চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, আর মনে হয়- মানুষ যেন দুনিয়া ছেড়ে আখেরাতের এক পবিত্র আবহে প্রবেশ করেছে।
রিয়াজুল জান্নাত কী?
মসজিদে নববির ভেতরে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর রওজা মোবারক ও তাঁর মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটিকেই বলা হয় রিয়াজুল জান্নাত। এই জায়গার ফজিলত সম্পর্কে নবীজি (স.) নিজেই ঘোষণা করেছেন- ‘আমার ঘর এবং মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটি জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।’ (সহিহ বুখারি: ১১৯৬)
এই হাদিসের কারণেই মুসলমানদের কাছে জায়গাটির গুরুত্ব অপরিসীম। সাহাবায়ে কেরামও এখানে নামাজ আদায়ের জন্য বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করতেন। সালামা বিন আকওয়া (রা.) নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট স্তম্ভের পাশে নামাজ পড়তেন এবং বলতেন, তিনি নবীজি (স.)-কে সেখানে নামাজ আদায় করতে দেখেছেন।
জান্নাতের বাগানের অনুভূতি
রিয়াজুল জান্নাতে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে সবুজ-সাদা কার্পেট, যা মসজিদের অন্য অংশের লাল কার্পেট থেকে একে আলাদা করেছে। দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি ও নীরব আধ্যাত্মিক পরিবেশ মুহূর্তেই হৃদয়কে নরম করে দেয়। মানুষের কোলাহল থাকলেও এখানে এক অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করে।
অনেকের চোখে পানি চলে আসে, কেউ মোনাজাতে ডুবে যান, কেউ আবার নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকেন। কারণ এই স্থান শুধু ইবাদতের জায়গা নয়, এটি নবীপ্রেমের এক জীবন্ত নিদর্শন। এখানে দাঁড়িয়ে মানুষ অনুভব করে- দুনিয়ায় থেকেও জান্নাতের সুবাস পাওয়া সম্ভব।
রহমতের স্তম্ভসমূহ
রিয়াজুল জান্নাতের ভেতরে রয়েছে কয়েকটি ঐতিহাসিক স্তম্ভ, যেগুলোকে ‘রহমতের স্তম্ভ’ বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর যুগে এগুলো ছিল খেজুর গাছের কাণ্ড। পরবর্তীতে উসমানি আমল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে এগুলো মার্বেল পাথর দিয়ে সংস্কার করা হয়।
উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্তম্ভ হলো-
উসতুওয়ানা আয়েশা (রা.): এই স্তম্ভের ফজিলত সম্পর্কে নবীজি (স.) বলেছিলেন, ‘আমার মসজিদে এমন একটি জায়গা আছে, লোকজন যদি সেখানে নামাজ পড়ার ফজিলত জানত, তবে সেখানে স্থান পাওয়ার জন্য লটারি করত।’ পরবর্তীতে হজরত আয়েশা (রা.) এই জায়গাটি চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন।
উসতুওয়ানা হান্নানা (রোদনকারী স্তম্ভ): নবীজি (স.) মিম্বর তৈরির আগে এখানে একটি খেজুর গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। মিম্বর তৈরির পর যখন তিনি গুঁড়িটি ছেড়ে মিম্বরে আরোহণ করলেন, তখন বিচ্ছেদের বেদনায় গুঁড়িটি শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। নবীজি নেমে এসে সেটিকে সান্ত্বনা দিলে সেটি শান্ত হয়।
উসতুওয়ানা তাওবা: সাহাবি আবু লুবাবা (রা.)-এর তওবা কবুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। নিজের একটি ভুলের অনুশোচনায় তিনি নিজেকে এই স্তম্ভের সাথে বেঁধে রেখেছিলেন এবং এখানেই তাঁর তওবা কবুল হয়।
উসতুওয়ানা উফুদ: যেখানে বিদেশি প্রতিনিধি দলগুলোর সঙ্গে রাসুল (স.) সাক্ষাৎ করতেন ও বৈঠক করতেন।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, ‘জান্নাতের বাগান’ বলার পেছনে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। কেউ বলেন, এখানে ইবাদত করলে মানুষ জান্নাতের পথে ধাবিত হয় এবং আল্লাহর বিশেষ রহমত লাভ করে। আবার অনেক মুহাদ্দিসের মতে, কেয়ামতের দিন এই অংশটুকুকে আল্লাহ তাআলা সরাসরি জান্নাতে স্থানান্তর করবেন।
যে ব্যাখ্যাই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট- এটি পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় স্থানগুলোর একটি।
বর্তমানে ভিড় নিয়ন্ত্রণে সৌদি সরকার আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে। “নুসুক” অ্যাপের মাধ্যমে আগাম পারমিট ছাড়া প্রবেশের সুযোগ নেই। পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা সময় নির্ধারিত থাকে।
তবে ইসলামি শিক্ষায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- রিয়াজুল জান্নাতে নামাজ পড়া হজ বা ওমরার কোনো ফরজ অংশ নয়। তাই ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি বা অন্যকে কষ্ট দেওয়া অনুচিত। বরং অল্প সময়ের মধ্যেও শান্তভাবে দুই রাকাত নামাজ ও দোয়া আদায় করাই প্রকৃত আদব।
রিয়াজুল জান্নাত নবীপ্রেম, আত্মিক প্রশান্তি ও আখেরাতের আশা জাগানিয়া এক অনন্য অনুভূতি। এখানে দাঁড়ালে মানুষ দুনিয়ার সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে যায়। হৃদয় ভরে ওঠে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও অশ্রুসিক্ত আবেগে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নবীজির রওজা জেয়ারত এবং জান্নাতের এই বাগানে ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।