বৃহস্পতিবার, ২৫শে জুন ২০২৬, ১১ই আষাঢ় ১৪৩৩
প্রতীকী ছবি
পবিত্র মহররম মাসের ১০ তারিখ অর্থাৎ আশুরার দিন ঘিরে মুসলিম সমাজে নানা ধরনের বিশ্বাস ও প্রথা প্রচলিত রয়েছে। তবে এর বড় একটি অংশের সঙ্গে কোরআন বা বিশুদ্ধ হাদিসের কোনো সম্পর্ক নেই।
মূলত সামাজিক রীতি এবং বংশপরম্পরায় চলে আসা এসব ভুল ধারণার ভিড়ে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে আশুরার মূল শিক্ষা।
আশুরার গুরুত্ব ও রোজার প্রেক্ষাপট
ইসলামী ইতিহাস অনুযায়ী, মহররমের ১০ তারিখে মহান আল্লাহ ফেরাউনের অত্যাচার থেকে হজরত মুসা (আ.) এবং বনী ইসরাইলকে মুক্তি দিয়েছিলেন। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দেখতে পান যে, ওখানকার ইহুদি সম্প্রদায় এই দিনে রোজা রাখছে। কারণ জানতে পেরে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে আমাদের অধিকার তাদের চেয়ে বেশি। এরপর তিনি মুসলমানদের এই দিনে রোজা রাখার নির্দেশ দেন।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে রমজান মাস এবং আশুরার দিন ছাড়া অন্য কোনো দিনের রোজার ফজিলত পাওয়ার জন্য এতটা উন্মুখ হতে দেখিনি। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা আবশ্যক ছিল। পরবর্তীতে তা ঐচ্ছিক বা নফল ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। তবে এর সওয়াব অনেক বেশি; এই একটি রোজার বিনিময়ে মহান আল্লাহ বান্দার বিগত এক বছরের ছোট গুনাহ মাফ করে দেন।
ভিত্তিহীন যত সামাজিক বিশ্বাস
আশুরার দিনটিকে কেন্দ্র করে এমন কিছু বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে, যা ইসলামের চার ইমাম বা কোনো নির্ভরযোগ্য আলেম সমর্থন করেননি। এগুলোর কোনো শক্ত প্রমাণ ইসলামী গ্রন্থে নেই। যেমন:
- এই দিনে হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল— এমন দাবির সপক্ষে কোনো সহিহ হাদিস নেই।
- এই দিনে হযরত ইব্রাহিম (আ.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন— এই তথ্যটিরও কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায় না।
- আশুরার দিনে গোসল করলে সারা বছর রোগবালাই থেকে দূরে থাকা যায়— এটি সম্পূর্ণ একটি লোকজ বিশ্বাস, যার কোনো ধর্মীয় ভিত্তি নেই।
- এই দিনে চোখে সুরমা দিলে চোখের জ্যোতি বাড়ে বা রোগ হয় না— এ ধারণার সপক্ষেও কোনো বিশুদ্ধ বর্ণনা নেই।
- বিশেষ খাবারের আয়োজন— আশুরার দিনে নির্দিষ্ট কোনো খাবার বা খিচুড়ি রান্না করে বিতরণ করার বিশেষ কোনো ধর্মীয় নির্দেশ ইসলামে নেই।স্বাভাবিকভাবে পরিবারের জন্য ভালো খাবারের আয়োজন করায় বাধা নেই, তবে একে সওয়াবের কাজ বা ধর্মীয় অংশ মনে করা ভুল।
- আশুরা কোনো অশুভ বা অপয়া দিন নয়— ইসলামে কোনো দিন বা ক্ষণকে অশুভ মনে করার সুযোগ নেই। প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মুফতি তাকি উসমানি জানান, কোনো দিন নিজে থেকে ভালো বা মন্দ হয় না। আল্লাহ যাকে মর্যাদা দেন, কেবল সেটিই মর্যাদাবান।
- ১০ই মহররম কেয়ামত হবে— এমন গুঞ্জনও ছড়ানো হয়, যার সপক্ষে কুরআন বা হাদিসের কোনো স্পষ্ট বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
আশুরা এবং কারবালা
মহররমের ১০ তারিখে মহানবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর সপরিবারে শাহাদাত বরণ ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। তবে আলেমরা স্পষ্ট করেছেন যে, কারবালার ঘটনার বহু আগে থেকেই আশুরার দিনটি পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ ছিল। আল্লাহ তায়ালা তার অসীম হেকমতে এই মর্যাদাবান দিনটিতেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দৌহিত্রকে শাহাদাতের উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। তাই আশুরার মূল আমল হলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও রোজা রাখা, কোনো ধরনের শোকের মাতম বা বুক চাপড়ানো নয়।
আশুরার সঠিক আমল
পবিত্র এই দিনে ইসলামসম্মত ও প্রমাণিত কাজগুলো অত্যন্ত সহজ:
- মহররমের ৯ ও ১০ তারিখে (অথবা ১০ ও ১১ তারিখে) রোজা রাখা। ইহুদিদের সংস্কৃতির সঙ্গে যেন মিলে না যায়, সেজন্য আল্লাহর রাসূল (সা.) দুটি রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন।
- বেশি বেশি আল্লাহর জিকির ও ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা।
- সাধ্যমতো দান-সদকা করা।
- হজরত মুসা (আ.)-এর মুক্তির ইতিহাস এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের গল্প থেকে শিক্ষা নেওয়া।