বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৯শে মাঘ ১৪৩২
ফাইল ছবি
মানুষের পর এই প্রথম কোনো প্রাণীর মধ্যে ‘কাল্পনিক বা রূপক খেলা’র (প্রিটেন্ড প্লে) প্রমাণ পেলেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের নিকটাত্মীয় হিসেবে পরিচিত বোনোবো শিম্পাঞ্জির মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে, যা এতদিন শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে ধারণা করা হতো।
৫ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, দুই বছর বয়সী মানব শিশুদের মতোই ‘কাঞ্জি’ নামের একটি বিশেষ বোনোবো কাল্পনিক চা-চক্রের সময় অদৃশ্য জুস ও আঙুরের হিসাব রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইংরেজি ভাষা বুঝতে পারার জন্য কাঞ্জির বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে মারা যাওয়া কাঞ্জি নিজে থেকে এই কাল্পনিক খেলা শুরু না করলেও, এতে অংশ নেওয়ার দক্ষতা প্রমাণ করে যে, অদৃশ্য বস্তু বা পরিস্থিতি কল্পনা করার মতো সক্ষমতা তার ছিল।
গবেষণার সহ-লেখক এবং জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজিক্যাল অ্যান্ড ব্রেইন সায়েন্সেস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্রুপেনিয়ে লাইভ সায়েন্সকে বলেন, এই ফলাফল দেখে আমরা সত্যিই বিস্মিত। আমরা এখানে যা দেখতে পাচ্ছি তা হলো—যে বিষয়টি মৌলিকভাবে মানুষের বৈশিষ্ট্য এবং যা মানুষের বিকাশের শুরুর দিকেই প্রকাশ পায়, তা আমাদের নিকটতম প্রাণীদের মধ্যেও বিদ্যমান।
গবেষক ক্রুপেনিয়ে জানান, এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে, বাস্তবে নেই এমন বস্তু কল্পনা করার সক্ষমতা মানুষের মধ্যে বিবর্তিত হয়েছে সম্ভবত ৬০ লাখ বছর আগে, মানুষ ও বোনোবোর পূর্বপুরুষরা একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার আগে।
কাল্পনিক বাস্তবতা
বন্দি এবং বন্য বানরজাতীয় প্রাণীদের (গ্রেট এপস) মধ্যে কাল্পনিক খেলার প্রমাণ এর আগেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় পাওয়া গিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, গিনিতে একটি ৩ বছর বয়সী বন্য শিম্পাঞ্জিকে পরিত্যক্ত পাতার কুশন মাথায় দিয়ে খেলতে দেখা গিয়েছিল। এ ছাড়া, বন্দি অবস্থায় থাকা একটি বোনোবোকে ছবি থেকে কাল্পনিকভাবে ফল তুলে খেতে দেখা গেছে।
তবে আগের এই উদাহরণগুলোর ভিন্ন ব্যাখ্যাও হতে পারে। যেমন: প্রাণীগুলো হয়তো কাল্পনিক বস্তুগুলোকে সত্যিই বাস্তব বলে ভুল করেছিল। এ কারণেই ক্রুপেনিয়ে এবং তার সহকর্মী যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট অ্যান্ড্রুজের মনোবিজ্ঞানী আমালিয়া বাস্তোস বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। তারা দেখতে চেয়েছিলেন, প্রাণীরা কি সত্যিই কল্পনা করতে পারে?
গবেষক ক্রুপেনিয়ে বলেন, যেহেতু কাঞ্জি ইংরেজি বুঝতে এবং প্রতিক্রিয়া জানাতে পারতো, তাই গবেষণার জন্য তাকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল।
গবেষণার শুরুতে কাঞ্জিকে একটি জুস রাখা পাত্র শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাকে দুটি স্বচ্ছ বোতল দেখানো হয়, যার একটিতে জুস ছিল এবং অন্যটি ছিল খালি। এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় জুস কোথায় আছে। সঠিক উত্তর দিতে পারলে পুরস্কার হিসেবে তাকে সামান্য জুস দেওয়া হতো। প্রশিক্ষণের এই ধাপে টানা ১৮ বার সঠিক উত্তর দিয়ে পূর্ণ নম্বর পায় কাঞ্জি।
মূল পরীক্ষার সময় একজন পরীক্ষক কাঞ্জির সামনের টেবিলে পাশাপাশি দুটি স্বচ্ছ খালি কাপ রাখেন। এরপর একটি খালি জগ থেকে দুটি কাপেই জুস ঢালার অভিনয় করেন তিনি। কিছুক্ষণ পর একটি কাপ থেকে সেই অদৃশ্য জুস আবার জগে ঢেলে ফেলা হয়। এরপর কাঞ্জিকে জিজ্ঞেস করা হয় কোন কাপে জুস আছে। তবে এই ধাপে সে সঠিক উত্তর দিতে পেরেছে কি না, তা তাকে জানানো হয়নি এবং তাকে কোনো পুরস্কারও দেওয়া হয়নি।
কাঞ্জি ৬৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই কাল্পনিক জুসের সঠিক অবস্থান শনাক্ত করতে পেরেছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যে সে ওই অদৃশ্য তরল পদার্থের হিসাব রাখতে সক্ষম ছিল।
তবে একটি সম্ভাবনা থেকে গিয়েছিল যে, সে হয়তো খালি কাপটিতে সত্যিই জুস আছে বলে ভুল করেছিল। বিষয়টি নিশ্চিত হতে গবেষক দলটি দ্বিতীয় আরেকটি পরীক্ষা চালায়। এবার তারা টেবিলের ওপর একটি জুস ভর্তি কাপ এবং একটি খালি কাপ রাখে। এরপর তারা খালি কাপটিতে জুস ঢালার অভিনয় করে এবং জুস ভর্তি কাপটির ওপর খালি জগটি ধরলেও ঢালার কোনো ভঙ্গি করেনি।
গবেষক ক্রুপেনিয়ে বলেন, কাঞ্জি যদি সত্যিই দুটি কাপেই জুস আছে বলে মনে করতো, তবে সে সমান হারে উভয় কাপকেই বেছে নিত। কিন্তু যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো সে কোন কাপটি চায়, কাঞ্জি ৭৭.৮ শতাংশ বারই আসল জুস রাখা কাপটি বেছে নেয়। এতে বোঝা যায়, সে আসল এবং কাল্পনিক জুসের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য করতে পারছিল।
ক্রুপেনিয়ে বলেন, এটি আমাদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে যে, আমরা আসলেই তার কাল্পনিক বা রূপক বস্তু শনাক্ত করার সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করছি।
গবেষক বাস্তোস জানান, এই পর্যায়েও তিনি কিছুটা সন্দিহান ছিলেন। কারণ, কাল্পনিক জুসের অবস্থান শনাক্ত করার বিষয়টি কাঞ্জির জন্য নিছক কাকতালীয়ও হতে পারত। তাই গবেষক দলটি একই পদ্ধতিতে কাল্পনিক আঙুর ব্যবহার করে পরীক্ষাটি পুনরায় চালায়। এই ধাপেও কাঞ্জি ৬৮.৯ শতাংশ ক্ষেত্রে কাল্পনিক আঙুরের সঠিক অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
বাস্তোস বলেন, তৃতীয় পরীক্ষাটি শেষ করার পর আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হই যে, আমরা যা দেখেছি তা আসলেই সঠিক ছিল।
গবেষণায় কেবল একটি বোনোবোর ওপর পরীক্ষা চালানোয় এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে গবেষক দলে যুক্ত না থাকা ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান্তা বারবারার বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানী লরা সিমোন লুইস লাইভ সায়েন্সকে পাঠানো এক ই-মেইলে বলেন, এটিই প্রথম স্পষ্ট প্রমাণ যে বৃহৎ বানরজাতীয় প্রাণীরা কাল্পনিক খেলায় অংশ নিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের গবেষণার ক্ষেত্রে এটি একটি বিশাল অগ্রগতি। কারণ এটি বন্য পরিবেশে দেখা আগের ঘটনাগুলোর স্বপক্ষে সরাসরি প্রমাণ দেয়। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, আমাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এই প্রাণীরা কাল্পনিক খেলাসহ সব ধরনের কাজেই নিজেদের কল্পনাশক্তি ব্যবহার করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, কাঞ্জি মানুষের তৈরি করা কাল্পনিক পরিস্থিতি বুঝতে পারলেও সে নিজে থেকে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারতো না। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী পল হ্যারিস লাইভ সায়েন্সকে বলেন, আমি মনে করি এটি বলা অনেক বড় অতিরঞ্জন হয়ে যাবে যে, আমরা এখানে দুই বছর বয়সী শিশুদের সমপর্যায়ের কিছু দেখতে পাচ্ছি। শিশুরা সাধারণত নিয়মিতভাবে নিজে থেকেই কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করে। যেমন—খালি কাপ থেকে পানি পানের অভিনয় করা।
গবেষক ক্রুপেনিয়ে এবং বাস্তোস আশা করছেন, এখন অন্যান্য বৃহৎ বানরজাতীয় প্রাণীদের মধ্যেও কাল্পনিক খেলার এই বৈশিষ্ট্যটি নিয়ে গবেষণা করা সম্ভব হবে। ক্রুপেনিয়ে বলেন, আগের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো যদি সত্য হয়, তবে অন্যান্য প্রজাতির বানরের মধ্যেও এই সক্ষমতা থাকার কথা।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)