শুক্রবার, ৮ই মে ২০২৬, ২৫শে বৈশাখ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
প্রতি বছর ৮ মে সারা বিশ্বে পালিত হয় বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। এই দিনটি শুধু একটি স্বাস্থ্য দিবস নয়, এটি লক্ষ লক্ষ পরিবারের নীরব কষ্টের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার দিন। বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি দশ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। প্রতি বছর প্রায় সাত হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অথচ সঠিক সচেতনতা ও বিয়ের আগে একটিমাত্র রক্ত পরীক্ষাই পারে এই দুঃখজনক বাস্তবতা বদলে দিতে।
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ। এই রোগে শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণে সুস্থ হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকার সেই বিশেষ প্রোটিন, যা ফুসফুস থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করে সারা শরীরে পৌঁছে দেয়। এই প্রোটিন ঠিকমতো না তৈরি হলে শরীরের কোষগুলো প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পায় না, ফলে রোগী দীর্ঘমেয়াদী রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হন। রোগটি মূলত দুটি প্রকারের — আলফা থ্যালাসেমিয়া এবং বেটা থ্যালাসেমিয়া। বাংলাদেশসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় বেটা থ্যালাসেমিয়াই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
থ্যালাসেমিয়া বাতাস বা স্পর্শে ছড়ায় না। এটি ছড়ায় জিনের মাধ্যমে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। যদি কেবল বাবা অথবা মা একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তাহলে সন্তান সাধারণত সুস্থ থাকে, তবে সে নিজেও বাহক হতে পারে। কিন্তু যদি বাবা এবং মা দুজনেই বাহক হন, তাহলে প্রতিটি সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজর নিয়ে জন্মানোর সম্ভাবনা থাকে চারটির মধ্যে একটি, অর্থাৎ পঁচিশ শতাংশ। ভয়ের বিষয় হলো, বাহকেরা সাধারণত নিজেও জানেন না যে তাদের শরীরে এই জিন বহন করছেন।
থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত শিশুরা জন্মের প্রথম কয়েক মাস পর থেকেই অসুস্থ হতে শুরু করে। শরীর ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে যায়, অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তি দেখা দেয়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। প্লীহা ও যকৃৎ বড় হয়ে পেট ফুলে ওঠে। হাড়ের গঠনে পরিবর্তন আসে, বিশেষ করে মুখমণ্ডলে। শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি থমকে যায়। সঠিক চিকিৎসা না পেলে এই শিশুরা দীর্ঘজীবী হতে পারে না।
থ্যালাসেমিয়া মেজরের চিকিৎসা দীর্ঘ, কষ্টসাধ্য এবং ব্যয়বহুল। রোগীকে সাধারণত প্রতি মাসে একাধিকবার রক্ত সঞ্চালন করতে হয়। কিন্তু বারবার রক্ত নেওয়ার ফলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমে যায়, যা হৃদযন্ত্র ও যকৃতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই পাশাপাশি আয়রন চিলেশন থেরাপিও চালিয়ে যেতে হয়। একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট, কিন্তু এই চিকিৎসা এতটাই ব্যয়বহুল যে বাংলাদেশের বেশিরভাগ পরিবারের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব হয় না। তাই প্রতিরোধই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর পথ।
বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং পরীক্ষা করলে সহজেই জানা যায় কে বাহক এবং কে নয়। যদি দেখা যায় যে হবু দম্পতির দুজনই বাহক, তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। এই একটিমাত্র পদক্ষেপ পারে একটি পরিবারকে আজীবনের কান্না থেকে রক্ষা করতে। পরীক্ষাটি সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যেও পাওয়া যায়।
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে কেবল চিকিৎসক বা সরকারের দায়িত্ব নয়, দায়িত্ব আমাদের সকলের। পরিবারে, পাড়ায়, মসজিদে, মন্দিরে সর্বত্র এই বিষয়ে কথা বলা দরকার। বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে রক্ত পরীক্ষাকে স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত করতে হবে। একটি সচেতন প্রজন্মই পারে আগামীর বাংলাদেশকে থ্যালাসেমিয়ামুক্ত করতে।
স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক; প্রতিষ্ঠাতা,এন্টিঅক্সিডেন্ট পাথওয়েজ