শুক্রবার, ১৯শে জুন ২০২৬, ৪ঠা আষাঢ় ১৪৩৩


যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যকার ১৪ দফা চুক্তিতে কী আছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত:১৮ জুন ২০২৬, ১৩:৩৪

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এ চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর থেকে কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছেন হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি দুই দেশের মধ্যকার ১৪ দফা চুক্তির বিস্তারিত তুলে ধরেছে।

ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেইনসে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির ফলে ‘হরমুজ প্রণালি’ আবারও উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে।

দুই দেশের মধ্যকার চুক্তিটি মূলত একটি সমঝোতা স্মারক। এতে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং দেশটির ‘পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের’ জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠন করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি শেষে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই প্রথম বড় কোনো কূটনৈতিক সাফল্য।

ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তিকে ‘পারফরম্যান্স-ভিত্তিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। অর্থাৎ ইরান প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে চুক্তির সুবিধাগুলো পাবে। চুক্তির অনেকগুলো অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। এ চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।

১. ‘সব ফ্রন্টে’ যুদ্ধের অবসান

চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ ‘সব ফ্রন্টে’ সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এই চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন ট্রাম্প। অন্যদিকে লেবাননকেও এ চুক্তির আওতায় রাখার জন্য বারবার দাবি জানিয়ে আসছিল তেহরান।

২. ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে’ হস্তক্ষেপ না করা

চু্ক্তির শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে। উভয় পক্ষ একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।

এ শর্তটি ইরানের বিরোধী দলগুলোর জন্য নেতিবাচক সংবাদ হতে পারে। কারণ ট্রাম্প ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

৩. ৬০ দিনের সময়সীমা

সমঝোতায় বলা হয়েছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে উভয় দেশ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করবে। তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা আরও বাড়তে পারে।

হোয়াইট হাউস বলছে, বুধবার রাতে ফ্রান্সের জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে নৈশভোজের পর ট্রাম্প এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এতে স্বাক্ষর করেছেন।

৪. অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ-অবরোধ এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা প্রত্যাহার করবে। এছাড়া আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে।

এর বিনিময়ে ইরানও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে। চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশের এলাকা থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করবে।

৫. হরমুজ প্রণালি

চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপতে চলাচলের ব্যবস্থা করবে। এজন্য কোনো ধরনের মাশুল বা ফি নেওয়া হবে না।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, মাইন অপসারণ এবং সামরিক বাধা দূর করার পর অবিলম্বে এই জলপথে জাহাজ চলাচল শুরু হবে। দীর্ঘমেয়াদে ওমান ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে মিলে ইরান এই প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বৃহত্তর চুক্তি করবে।

৬. ইরানের পুনর্গঠনে তহবিল

ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। যদিও এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্থ প্রদান করবে না। তারা কেবল প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমতি দেবে।

৭. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবসহ সব ধরনের একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। তবে এটি এখনই কার্যকর করা হবে না। চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনার মাধ্যমে এটি ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।

৮. পারমাণবিক অস্ত্র

চুক্তিতে ইরানের কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। বর্তমানে তেহরানের কাছে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে ধ্বংস বা মান কমিয়ে ফেলা হবে। ট্রাম্প বলেছেন, এই অভিযানের বড় লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখা।

৯ ও ১০. বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা

চুক্তিতে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর নতুন করে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি তেল রপ্তানি ও ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কিছু ছাড় দেওয়া হবে।

১১. জব্দ অর্থ ফেরত

ইরান চুক্তির শুরুতেই বিদেশে জব্দ করা অর্থ ফেরকের দাবি জানিয়ে আসছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র অর্থ ছাড় দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে। ইরানের আচরণের ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে এই অর্থ ছাড় করা হবে।

১২-১৪. তদারকি ও চূড়ান্ত আলোচনা

চুক্তিটি ঠিকমতো বাস্তবায়নের বিষয়টি তদারকির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। এই সমঝোতার ওপর ভিত্তি চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু হবে। এটিকে শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশনের মাধ্যমে আইনি বাধ্যবাধকতা দেওয়া হবে।

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়