ফোকলোর হলো দলবদ্ধ মানুষের ঐতিহ্য পরম্পরায় বাহিত লোকজ্ঞান, যা মানুষ তার জন্মের সময় আপনা-আপনি পুরুষাক্রমে লাভ করে এবং নিজের অজান্তে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়। আমাদের দেশে ইংরেজি Folklore-এর বাংলা প্রতিশব্দ করা হয়েছে লোকসংস্কৃতি, কিন্তু দুটো বিষয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
ফোকলোর হলো জনমানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি। এর কোনো একক উদ্ভাবক নেই, সমাজের সবাই তার অংশীদার। যে জনপদই জন্মাক না কেন প্রতিটি শিশু তার স্বকীয় ফোকলোর আবহে নিজের মতন করে বেড়ে ওঠে। জাতির মানস-গঠনের ধরণ-ধারণ শত-শত বছর ধরে লোকঐতিহ্যের মধ্যে প্রবহমান রয়েছে।
বর্তমান পৃথিবীতে ফোকলোরকে নির্দিষ্ট রেখায় সীমায়িত করা যায় না। ফোকলোর একই সঙ্গে আঞ্চলিক আবার বিশ্বজনীন। আবহমানকাল থেকে বাংলার রয়েছে হাজার বছরের গর্ব করার মতন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এর ভিত ভাষিক হলেও সংস্কৃতির ছোট ছোট নানা অনুষঙ্গ এতো গভীরে বাঙালির মনোজগতে প্রথিত আছে যে তাকে সহজে আলাদা করা যায় না।
প্রতিনিয়ত বাঙালি জীবনে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে তার বাঙালিয়ানা তথা ফোকলোরের নানান বস্তুগত ও অবস্তুগত উপকরণাদি। বিশেষত শিশুর মনগঠনে ফোকলোরের রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। জন্মানোর পর থেকে প্রতিটি শিশু বেড়ে ওঠে লোকসংস্কৃতির আবহে। শিশুকে বাংলাদেশের নিজস্ব ফোকলোরের উপাদান-উপকরণের সঙ্গে পরিচয় করানো প্রতিটি অভিভাবকের নৈতিক দায়িত্ব, কারণ ফোকলোরকে জানার মাধ্যমে সে তার দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি অনুরক্ত হয়ে উঠবে।
বাঙালি শিশুর মননে ফোকলোর ঠিক কতটা প্রভাব রেখে চলেছে তা জানা যাক—নানাবিধ লোকবিশ্বাস-লোকসংস্কারের সঙ্গে শিশুদের আজন্ম বসবাস। সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস-সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করা তাই যে আবালবৃদ্ধবনিতা যে কারও পক্ষে কঠিন। নানা বিধি-নিষেধ মানার মধ্য দিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক সংহতি রক্ষা পায়।
কী করলে নিজের তথা পরিবারের ইহলৌকিক মঙ্গল হবে তা বাঙালি মেয়েরা শৈশবেই নানা ব্রতের মাধ্যমে জেনে যায়। পারিবারিক সুখ ও শান্তি লাভের আশায় বাঙালি কুমারী মেয়েরা সারাবছর ধরে নানা ব্রত পালন করে। ইতু ব্রত, সুবচনী ব্রত, পুণ্যিপুকুর পুকুর, পৃথিবী ব্রত, সন্ধ্যামণি ব্রত, সুয়ো-দুয়ো ব্রত, সম্পদ ব্রত, করম ব্রত, ক্ষেত্র ব্রত, মঙ্গলচণ্ডী ব্রতসহ বিভিন্ন ব্রত পালনের মধ্য দিয়ে বাড়ির মেয়েরা তাদের পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
পরিবারের প্রতি দরদ-ভালোবাসা, কর্তব্যবোধের প্রকাশ ঘটে ব্রতানুষ্ঠানের মাধ্যমে। অর্থাৎ ইহলৌকিক জীবনের সবক্ষেত্রে যাতে মঙ্গল সাধিত হয়, সেজন্য শৈশবেই বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালনের সঙ্গে শিশুদের পরিচয় থাকা জরুরি। যেমনটা জরুরি লোকছড়া, ধাঁধা, প্রবাদ, লোকপুরাণ, গীতিকা, লোকসংগীত, লোকনাটক, লোকক্রীড়া, লোকশিল্পজাত বিভিন্ন বিষয়ে সম্যক ধারণা থাকা। পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমেই শিশুরা এই ধারণা লাভ করে।
শিশুরা তাদের শৈশবকে রাঙিয়ে তোলে জল-স্থলের নানা লোকখেলার মাধ্যমে। বাংলাদেশের গ্রামীণ শিশুরা লাঠিখেলা, গোল্লাছুট, বাঘবন্দি, বউরানী, রুমাল চুরি, আগডুম বাগডুম, ইকরি-মিকরি, বৌচি, লুকোচুরি, এক্কা দোক্কা, ছিবুড়ি, হাডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, ডুব ডুব ইত্যাদি বিভিন্ন লোকক্রীড়ার বা খেলাধুলার মধ্য দিয়ে নিজেদের শৈশব-কৈশোরের সুন্দর সময়গুলো নিমিষেই পাড়ি দেয়।
শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি পায় লোকখেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে। পারস্পরিক সৌহার্দ্য রচিত হয় বিভিন্ন লোকখেলার মাধ্যমে। লোকক্রীড়ার সুদূরপ্রসারী প্রভাব থেকে যায় শিশুর মনের গভীর থেকে গভীরে। লোকখেলার সময় যে বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়, তার রেশ থাকে জীবনভর।
বর্তমান বিচ্ছিন্নতার সময়ে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা যে কতটা জরুরি? তা সমাজবিজ্ঞানীরা নতুন করে বলছেন। সামাজিক বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত শিশুরা মনগত-দেহগত দিক থেকে ক্রমশ দুর্বল হয়ে সমাজের মূল ধারা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। সামাজিক মাধ্যমের নানা অসঙ্গতি চিত্র দেখে তাদের মননে নানা বিরূপ প্রভাব পড়ছে। গৃহবন্দি শিশুরা অপরিচিত বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গেইমে নিজেদের সবসময় ব্যতিব্যস্ত রাখছে, ফলে তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মাত্রাও অনেকখানি বেড়ে গেছে।
অপরদিকে লোকক্রীড়ার মাধ্যমে খুব সহজেই স্বাস্থ্য ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে আনা যায়। লোকক্রীড়ায় সাধারণত ব্যয়বহুল নয়, প্রকৃতির সহজ-সরল উপকরণ দিয়ে খেলা যায় বলে সারাদেশে লোকক্রীড়ার জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় অনেকগুণ বেড়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মনোবিজ্ঞানীরা শিশুদের বেশি করে খেলাধুলায় অংশ নিতে পরামর্শ দিচ্ছেন। শিশুদের দেশীয় লোকখেলার সঙ্গে পরিচয় করানোর মাধ্যমে সুস্থ সমাজ নির্মাণ করা সম্ভব হবে। আর সবাই জানে শিশুরাই আগামীর বাংলাদেশ। রাষ্ট্রকে সে দিকেই নজর দিতে হবে। প্রতিটি অভিভাবকদের উচিত হবে তাদের সন্তানকে বিভিন্ন লোকখেলায় অংশগ্রহণ করানো।
লোকখেলার পাশাপাশি শিশুদের রঙিন শৈশবের কল্পনার জগত বিস্তৃত হতে পারে বাংলা লোককাহিনির বিশাল ভাণ্ডারের সঙ্গে যদি তাদের জীবনের শুরুতেই পরিচয় হয়। নানী-দাদিরা একসময় বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর সময় নানা ধরনের বীরকাহিনি, পরিকাহিনি, পশুকাহিনি, ভৌতিককাহিনি, শিকলিকাহিনি, পৌরাণিককাহিনি, বোকারকাহিনি ইত্যাদি বলতেন।
শিশুরা সেসব গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তো, তারা চলে যেত কল্পনার বিস্তৃত জগতে। রাজপুত্র, রাজকন্যার বেশে ঘুরে বেড়ানো মেঘের দেশে, পাতাল রাজ্যে। রাজ্যজয়ের আত্মপ্রসাদ নিয়ে গভীর ঘুমে কখন যে তারা আচ্ছন্ন হয়ে যেত তা আর কারও খেয়াল থাকতো না।
দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদার ঝুলি, ঠানদিদির থলে, এসব বইয়ে লেখার হরফে বাংলা রূপকথার অমূল্য সব কাহিনি লিপিবদ্ধ করে গেছেন আজ থেকে প্রায় ১২০ বছর আগে। আজও তার আবেদন একই, এতটুকু কমেনি; বরং দিনকে দিন তা বেড়েই চলেছে।
তাই, শিশুদের প্রতিনিয়ত বাংলা লোককাহিনি শোনাতে হবে। লোককাহিনির মধ্য দিয়ে তারা নিজের দেশের ঐতিহাসিক নানা ঘটনা সম্পর্কে যেমন জানতে পারবে ঠিক তেমনি ভবিষ্যৎ দেশগঠনে বীরদের স্মরণ করে এগিয়ে যেতে পারবে।
গল্প-কাহিনি শুনতে কার না ভালো লাগে। গল্প বলার মধ্য দিয়ে বাবা-মার সঙ্গে শিশুর যে আত্মিক বন্ধন রচিত হবে তাকে কখনো ছিন্ন করা যায় না। আকাশ সংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব থেকে বাঙালি শিশুদের রক্ষার সহজ উপায় হলো বাংলা লোককাহিনির সঙ্গে পরিচয় করানো।
একসময় শিশরা খেলার সময় বিভিন্ন লোকছড়া বলতো। ঘুম পাড়ানোর জন্য মা-বাবা, নানি-দাদিরা ছেলে ভোলানো ছড়া মুখে-মুখে কাটতো। ছড়ার বোল শুনে শিশু ঘুমের জগতে প্রবেশ করতো। লোকছড়া ছিল শিশুর দৈনন্দিন সঙ্গী। ছড়াকে মনে করা হয় আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘ।
ছাড়ার মতো পরস্পরের বুদ্ধির পরীক্ষা নিতে শিশুরা একে অপরের কাছে ছিলক বা ধাঁধা জিজ্ঞেস করতো। ধাঁধা হলো বুদ্ধির খেলা। পরস্পরের বুদ্ধি পরখ করার সহজ কৌশল ছিল ধাঁধা ধরা। ধাঁধার বহুল ব্যবহার এখনো সমাজে আছে। ধাঁধার মতো প্রবাদ বাক্য বলার মধ্য দিয়ে সমাজের নানা অসঙ্গতির দিকে দৃষ্টি দেওয়া হতো।
প্রবাদ হচ্ছে মানুষের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার ফসল। প্রবাদ বাক্যের মতো চাঁদ, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, গাছ, নদী, সমুদ্র, পুকুর, মাছ এসব নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে কতশত পুরাণ। পৌরাণিক কাহিনির মধ্য দিয়ে সমাজের ইতিহাসের নানা বাঁকের উপকরণকে খুঁজে পাওয়া যায়। লোকপুরাণ লোকমানুষের সহজাত সৃষ্টি।
বিভিন্ন বিষয়ে এখনকার শিশুদের সারাক্ষণ নানা কর্মকাণ্ডে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়। সারাক্ষণ পড়া আর পড়া। বিনোদন বলতে তাদের যেন কিছুই নেই। প্রতিটি শিশুর মুখের দিকে তাকালে দেখা যায় মুখখানা মলিন, নিজে থেকে তারা কোনো কাজে উৎসাহ পায় না। উৎসাহ দানের জন্য শিশুদের দেশের লোকসংস্কৃতির সঙ্গে আরও বেশি করে পরিচয় করাতে হবে। শিশুদের বিভিন্ন গ্রামীণ লোকমেলায় নিয়ে যেতে হবে। গ্রামীণ বা লোকমেলায় হরেক জিনিসের সমাহার দেখা যায়। লোকমেলায় এমন কিছু জিনিসের সমাগম হয় যা মেলার সময় ছাড়া অন্য সময়ে দেখা মেলে না।
মেলা হলো বিভিন্ন বয়সী মানুষের মিলনস্থল। মেলাকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। মেলার টমটম, লাটিম, ঘুড়ি এসব কেনার মধ্য দিয়ে শিশুরা খুঁজে পায় নির্মল আনন্দ। মেলার মণ্ডা-মিঠাই বিশেষত আমিত্তি-জিলাপি, রসগোল্লা, বাতাসা, নকুলদানা, দানাদার মিষ্টিতে মন ভেজেনি এমন শিশু বাংলার কোথাও নেই?
নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, সাপখেলা, বানরখেলা, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, বাউল, মুর্শিদি, জারি, সারি, কীর্তন, গম্ভীরা, আলকাপ, বারমাসি, পটের গান, কবিগান ইত্যাদি লোকসংগীত; ঢালি নাচ, কাঠি নাচ, ঝুমুর নাচ, বাউল নাচ—এসবের সাথে পরিচয় করাতে হবে।
একতারা, দোতারা, খঞ্জনি, মাদল, ঢাক, সারেঙ্গী, ডুগডুগি, সারিন্দা, আড়বাঁশিসহ নানা দেশীয় লোকবাদ্যযন্দ্রের সঙ্গে শৈশবেই পরিচয় থাকা ভালো। নাচ-গানের মাধ্যমে মনের মলিনতা অনেক দূর হয়ে যায়। মানবিক মানুষ গঠনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জোরালো ভূমিকা আছে।
শিশুর নরম মনে দাগ কাটতে পারে যাত্রা, চুরচুন্নী, বোলান, আলকাপ, দাইঘুরার মতন বিভিন্ন লোকনাটকের আসর। লোকনাটকের নাচ-গানের মাধ্যমে শিশুরা দ্রুত বুঝতে পারে তাঁর আসল সংস্কৃতিকে। টেপাপুতুল, সখের হাঁড়ি, লক্ষ্মীর সরা, মুখোশ, পাখা, টমটমগাড়ি, কাঁচের রকেট, মাটির নানা ধরনের খেলনা শিশু মনে যে প্রভাব রাখে তা আর কোনো কিছুর মাধ্যমেই হয় না।
আঞ্চলিক বিভিন্ন খাবার, পোশাক, বাস্তুবিদ্যার সম্বন্ধে সম্যক ধারণা শিশুকালেই দিতে হবে। বয়নশিল্প, দারুশিল্প, মৃৎশিল্প, শঙ্খশিল্প, শোলাশিল্প, ধাতুশিল্প, বাঁশবেতশিল্প, রন্ধনশিল্প ইত্যাদির সঙ্গে শিশুদের বেশি বেশি করে পরিচয় করাতে হবে।
যত বেশি শিশু দেশের লোকসংস্কৃতি তথা ফোকলোরকে জানতে পারবে তত বেশি সে বাঙালি সংস্কৃতির বিষয়ে দরদি হয়ে উঠবে। দেশের স্বীয় সংস্কৃতি রক্ষায় সে-ই একসময় এগিয়ে আসবে। ফোকলোর দেশপ্রেম বা বাঙালিয়ানা তৈরিতে যে ভূমিকা রাখতে পারে তা আর কোনোভাবে সম্ভব নয়। শিশুরা ফোকলোর চর্চার মাধ্যমেই সুস্থ ও সুন্দর আগামীর বাংলাদেশ রচনা করতে পারবে।
উদয় শংকর বিশ্বাস : অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)