শনিবার, ৬ই জুন ২০২৬, ২৩শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ফাইল ছবি
মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েল কি নজরদারি করছে? ইরান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার মতপার্থক্য ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসরায়েলি গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে পেন্টাগনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইসরায়েলি এই নজরদারি প্রচেষ্টার লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন বলে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে দু’জন বর্তমান ও একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) সম্প্রতি ইসরায়েলের কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স হুমকির স্তরকে সর্বোচ্চ অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন স্তর বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে উন্নীত করা হয়েছে।
দেশটির এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে বলেছেন, ইসরায়েল সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন শুরু করেছে। তিনি বলেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে দীর্ঘদিন ধরেই তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আগ্রাসী হিসেবে দেখছে পেন্টাগন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ধরনের সতর্কতার মধ্যে রয়েছে বার্নার ফোন (একবার ব্যবহারযোগ্য ফোন), সাময়িক কম্পিউটার এবং কঠোর যোগাযোগ প্রোটোকলের ব্যবহার। বিশেষ করে উচ্চ-পর্যায়ের সফরগুলোর সময় এসব বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মার্কিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ইসরায়েলে থাকাকালীন প্রায়ই হোটেল কক্ষ এবং অন্যান্য সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে চলেন।
এসব পদক্ষেপ মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের প্রতিফলন বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান সংঘাতের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের তথ্য সংগ্রহের জন্য আগ্রাসী প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ইসরায়েল।
• মূল্যায়ন নথিতে উদ্বেগ
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যের পটভূমিতে গত কয়েক সপ্তাহে এই মূল্যায়ন করেছে পেন্টাগন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত মার্কিন কর্মকর্তারা এনবিসি নিউজকে বলেছেন, ডিআইএ একটি অভ্যন্তরীণ নোটিশ জারি করেছে; যার সঙ্গে সাত পৃষ্ঠার মূল্যায়ন নথি যুক্ত ছিল। সেখানে ইসরায়েলের তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে যে, ইসরায়েলের গুপ্তচরবৃত্তি এবং প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহ—উভয় সক্ষমতাকেই ‘‘ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে’’ সক্রিয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। নথিতে কয়েকটি ঘটনার বিবরণ রয়েছে; যা এই উদ্বেগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। যদিও দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা এমন কোনও একক ঘটনা সম্পর্কে জানেন না, যা সরাসরি এই সিদ্ধান্তকে প্ররোচিত করেছে।
এই গোয়েন্দা মূল্যায়নের ব্যবহারিক প্রভাব ইসরায়েল সফরকারী কিংবা ইসরায়েলি প্রতিপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগকারী মার্কিন কর্মীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দ্রুত অনুভূত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির বর্তমান ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, মার্কিন কর্মকর্তারা অতিরিক্ত নিরাপত্তা সতর্কতা অবলম্বন করতে পারেন। যদিও দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান অপরিবর্তিত রয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এমিলি হার্ডিং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ‘‘অতি-আগ্রাসী’’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘আমরা কী করছি সে সম্পর্কে তাদের অত্যন্ত গভীর আগ্রহ রয়েছে।’’
• অভিযোগ অস্বীকার ইসরায়েলের
তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালানোর অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে ইসরায়েল। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরায়েলি দূতাবাসের একজন মুখপাত্র মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারির দাবিকে ‘‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, মার্কিন সরকারি কর্মকর্তাদের তো দূরের কথা, আমেরিকান কোনও প্রতিষ্ঠানের গোয়েন্দা তথ্যও সংগ্রহ করে না ইসরায়েল। তিনি বলেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা অভিযান মিত্রদের বিরুদ্ধে নয়, বরং শত্রুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তাও এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবেদনটিকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, এসব তথ্য এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে, যাদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে কোনও জ্ঞান নেই।
মিত্রদের মাঝে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা অস্বাভাবিক কিছু না হলেও বর্তমান এবং সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা ইসরায়েলের এই কথিত তৎপরতাকে বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর মধ্যে সাধারণত মেনে নেওয়া গুপ্তচরবৃত্তির স্বাভাবিক পরিধির বাইরে বলে মনে করছেন।
• ইরান নিয়ে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সম্পর্কে ফাটল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের এক নাজুক মুহূর্তে এই উদ্বেগের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইরানের সঙ্গে একটি বিস্তৃত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, তেহরান কোনও সমঝোতা চুক্তি মেনে চলবে কি না, সেই বিষয়ে জনসমক্ষে প্রশ্ন তুলেছেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক চাপ প্রয়োগের পক্ষে কথা বলা অব্যাহত রেখেছেন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন।
এনবিসিবি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি এক উত্তপ্ত ফোনালাপে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার উত্তেজনার বিষয়টি সামনে আসে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরে ইসরায়েলি নেতাকে ‘পাগল’ বলে ডাকার কথা স্বীকার করেন। যা মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে এই দুই মিত্রের মাঝে বিভেদ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে বলে যে জল্পনা রয়েছে, তা উস্কে দিয়েছে।