মঙ্গলবার, ২রা জুন ২০২৬, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
এ বছর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গণহারে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়ার নয় বছর পূর্ণ হবে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) তার অংশীদারদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যাতে তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ভুলে না যায়। এদের বেশির ভাগই কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাস করছেন।
মঙ্গলবার (২ জুন) জেনেভার পালে দে নাসিওঁ-এ অনুষ্ঠিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বাবর বালোচ এ আহ্বান জানান।
ইউএনএইচসিআর বলছে, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে আসছেন এবং বাংলাদেশ সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে পর্যায়ক্রমে আসা এই শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। সবচেয়ে বড় ঢলটি আসে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে, যখন প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদার সহায়তা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এমন এক সময়ে ইউএনএইচসিআর এই আহ্বান জানাচ্ছে, যখন বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতা এবং মানবিক সংকটের চাপ বাড়ছে। এর ফলে সীমিত সম্পদের মধ্যে কঠিন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য অপরিহার্য সেবাগুলো হুমকির মুখে পড়ছে।
গত মাসে বাংলাদেশে জাতিসংঘ এবং এর অংশীদাররা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন করে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে, রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্থানীয় আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের আবেদন করেছে। প্রয়োজন বাড়তে থাকলেও এই অতিগুরুত্বপূর্ণ চাহিদাভিত্তিক আবেদনটি গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম।
২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী কার্যক্রমে মানবিক অর্থায়ন বাংলাদেশকে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা বজায় রাখতে এবং শরণার্থীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষায় বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জনে সহায়তা করেছে। তবে উল্লেখযোগ্য মানবিক চাহিদা রয়ে গেছে এবং অব্যাহত আন্তর্জাতিক সংহতি ছাড়া রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর দুর্দশা আরও বাড়বে।
মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁটের প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এখনও ব্যাপকভাবে ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগ এবং কমে যাওয়া সহায়তা পরিবারগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে নারী ও কন্যাশিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ এবং ২০২৪ সালের শুরু থেকে রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার নতুন আগত মানুষের জন্য।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতা, নিপীড়ন এবং সংঘাত অব্যাহত থাকায় নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। ফলে অনেক শরণার্থী মরিয়া সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন, অনেক শরণার্থী ভালো জীবনের আশায় অন্য দেশে যেতে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নিচ্ছেন, যেখানে প্রাণহানির আশঙ্কাও থাকে। ২০২৫ সাল ছিল এই ধরনের যাত্রার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সহায়তার আবেদনটি সবচেয়ে জরুরি মানবিক প্রয়োজনগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের মর্যাদা ও ভবিষ্যতের আশা ধরে রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদে ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে তাদের আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই অতিজরুরি সহায়তা আবেদনে ইতোমধ্যে সাড়া দিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অর্থের ৬০ শতাংশ পাওয়া গেছে। তবে শুধু ন্যূনতম সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে শরণার্থীদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে সংকট মোকাবিলায় আরও বেশি ব্যয় ও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
মিয়ানমারে সংঘাত ও সহিংসতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশে থাকতে হবে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরিতে প্রচেষ্টা চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।